ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

তীব্র গরম ও অনাবৃষ্টি

কাপ্তাই হ্রদে নামছে পানির স্তর

যাতায়াতে ব্যাপক দুর্ভোগ ছয় উপজেলাবাসীর

কাপ্তাই হ্রদে নামছে পানির স্তর
×

তীব্র তাপে শুকিয়ে গেছে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদের একাংশ। এতে যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের। গতকাল মঙ্গলবার সকালে শহরের চাকমা রাজবাড়ী ঘাট এলাকায় -সমকাল

সত্রং চাকমা, রাঙামাটি

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ০৭:৪০

| প্রিন্ট সংস্করণ

তীব্র গরম ও অনাবৃষ্টির কারণে রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে কমে যাচ্ছে পানির স্তর। পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রের পাঁচটির ইউনিটের মধ্যে দুটি চালু রাখা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, এসব ইউনিটে মাত্র ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে। পানি কমতে থাকায় রাঙামাটি সদরের সঙ্গে ছয়টি উপজেলার নৌ যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যাত্রী নিয়ে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছে না লঞ্চ। ফলে জনসাধারণের যাতায়াত খরচ বেড়েছে। 
১৯৬০ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ নির্মিত হয়। ফলে ২৫৬ বর্গমাইল এলাকায় সৃষ্টি হয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ মানবসৃষ্ট হ্রদ। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিটের উৎপাদন ক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটির নিয়ন্ত্রণ কক্ষ সূত্রে গতকাল জানা গেছে, পানির স্তর নেমে যাওয়ায় মাত্র দুটি ইউনিটে উৎপাদন সচল রয়েছে। এখানে উৎপাদিত হচ্ছে ৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কাপ্তাই হ্রদে পানির ধারণক্ষমতা ১০৯ এমএসএল (মেইন সি লেভেল)। গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত কাপ্তাই হ্রদে পানির উচ্চতা ছিল ৭৩ দশমিক ৯৯ এমএসএল। এই সময়ে হ্রদে পানির স্তর থাকার কথা ছিল ৭৮ দশমিক ০৮ এমএসএল। গত বছর একই পানির উচ্চতা ছিল ৭৭ দশমিক ৩০ এমএসএল। এই হ্রদে পানির স্তর ৬৮ এমএসএলকে বিপজ্জনক হিসেবে ধরা হয়। এর নিচে নেমে গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। 
পানির স্তর নেমে যাওয়ায় নাব্য সংকটে পড়েছে নৌরুটগুলো। জেলার ১০ উপজেলার মধ্যে বিলাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি, বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর ও লংগদুর সঙ্গে নৌ যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তিন মাস আগেই নানিয়ারচর ও বাঘাইছড়ির সঙ্গে লঞ্চ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। তবে রাঙামাটি সদর থেকে বিলাইছড়ি উপজেলার এসভ্যান নামক জায়গা পর্যন্ত যাত্রীবাহী লঞ্চ পৌঁছাতে পারছে। সেখান থেকে ছোট বোট বা ডিঙ্গি নৌকায় করে উপজেলা সদরে পৌঁছাতে হচ্ছে। 

এ ছাড়া জুরাছড়ি উপজেলায় নতুন বাজার পর্যন্ত লঞ্চ গেলেও সেখান থেকে ছোট বোট বা ভেলায় করে গন্তব্যে যেতে হচ্ছে উপজেলাবাসীকে। বরকল উপজেলায় সদর ও লংগদু উপজেলার কাটতলীবিল পর্যন্ত এখন লঞ্চ যেতে পারছে। এসব উপজেলাবাসীকে যাতায়াতে চরম দুর্ভোগের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হচ্ছে চড়া দামে। বিপরীতে কৃষকেরাও পণ্য সঠিকভাবে বাজারজাত করতে না পারায়ও লোকসান গুনছেন। হ্রদের বিভিন্ন জায়গায় ছোটবড় অসংখ্য ডুবোচর জেগে উঠায় যাতায়াত বিপদজনক হয়ে পড়েছে। 
চাকমা রাজবাড়ী ঘাটের মাঝি খোকন গতকাল মঙ্গলবার বলেন, গত বছরের চেয়ে এ বছর পানির স্তর অনেক নেমে গেছে। পানি কমায় নৌকা দিয়ে যাত্রী পারাপার সম্ভব হচ্ছে না। তাই রাজবাড়ী এলাকায় বাঁশের সাঁকো তৈরির কথা ভাবছেন তারা।
বিলাইছড়ির বাসিন্দা পুষ্প চাকমার ভাষ্য, রাঙামাটি সদর থেকে বিলাইছড়ি উপজেলা সদরে পৌঁছাতে দুই দফায় নৌকা বদল করতে হচ্ছে। এতে দুর্ভোগের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিলাইছড়ি থেকে রাঙামাটি শহরে যেতে চাইছেন না কেউই। 

জুরাছড়ির বাসিন্দা সুমন্ত চাকমার দেওয়া তথ্যমতে, উপজেলায় নতুন বাজার পর্যন্ত লঞ্চ যাচ্ছে। বাকি অর্ধেক পথ ডিঙ্গি নৌকায় করে যেতে হচ্ছে। জুরাছড়ি সদরে যে কোনো পণ্য নিতে গেলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি কেজিতে আট টাকা করে ক্যারিং চার্জ দিতে হচ্ছে। উপজেলাবাসীকে দুর্ভোগের পাশাপাশি এ কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যও কিনতে হচ্ছে বেশি দামে। 
রাঙামাটি লঞ্চ মালিক সমিতির সভাপতি মঈন উদ্দীন সেলিম জানান, রাঙামাটি সদরের সঙ্গে ছয় উপজেলার লঞ্চে যাতায়াতের পথ অর্ধেকে নেমে এসেছে। বাঘাইছড়ি ও নানিয়ারচরের সঙ্গে তো তিন মাস ধরেই লঞ্চ যোগাযোগ বন্ধ। সপ্তাহখানেকের মধ্যে ভারী বর্ষণ না হলে জেলা সদরের সঙ্গে লঞ্চ যোগাযোগ আরও অর্ধেকে নামতে পারে। তাঁর ভাষ্য, কাপ্তাই হ্রদে খনন না করায় তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। যে কারণে প্রতিবছর শুকনো মৌসুমে নৌপথে যাতায়াতে এসব উপজেলার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কোনো ইউনিটেই কারিগরি ত্রুটি নেই। কিন্তু পানি সংকটে সবগুলো ইউনিট চালানো যাচ্ছে না। গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ৫টি ইউনিটের মধ্যে ২ নম্বর ইউনিটে ৩৩ মেগাওয়াট ও ৩ নম্বর ইউনিটে ২৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। দ্রুত সময়ে যদি বৃষ্টিপাত না হয় তবে সচল ইউনিটগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে। ভারী বর্ষণে হ্রদে পানি বাড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে।
প্রকৌশলী মাহমুদ হাসানের দেওয়া তথ্যমতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাঁচটি ইউনিট চালু করা হয় রোটেশন অনুযায়ী। এর মধ্যে ৪ নম্বর ইউনিটটি গত সোমবার বন্ধ করা হয়েছে। ৫ নম্বর ইউনিটটি মে মাসে বন্ধ করা হয়। আর ১ নম্বর ইউনিটটি এপ্রিল মাসে বন্ধ করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যে ভারী বর্ষণ না হলে চালু দুটি ইউনিটের একটি বন্ধ করতে হবে।

আরও পড়ুন

×