ভাসমান স্কুলের জন্য ইউনেস্কোর পুরস্কার পেল সিধুলাই
ছবি: সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক ও চাটমোহর (পাবনা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ২২:২৫
চলনবিল এলাকায় সৌরশক্তিচালিত ভাসমান বিদ্যালয়ের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা। এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সংস্থাটি ‘ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার-২০২৫’ পেয়েছে। বুধবার রাজধানীর এক হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী এবং উপ-আনুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোর (বিএনএফই) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দেবব্রত চক্রবর্তী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও অফিসপ্রধান ড. সুসান ভাইজ। সূচনা পর্বে ইউনেস্কো ঢাকার শিক্ষা বিভাগের প্রধান নোরিহিদে ফুরুকাওয়া আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫ এবং এ বছরের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল যুগে সাক্ষরতার প্রসার’ বিষয়ে উপস্থাপনা করেন।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, দেশের জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও ভৌগোলিকভাবে দুর্গম এলাকায় শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উদ্ভাবনী উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগ শিক্ষায় অন্তর্ভুক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও দক্ষ ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলতে সহায়তা করছে।
সাক্ষরতার রূপান্তরমূলক শক্তির ওপর গুরুত্বারোপ করে সুসান ভাইজ বলেন, সাক্ষরতা কেবল পড়ালেখা শেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষকে তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, জীবনের সুযোগগুলো কাজে লাগানো এবং সমাজে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণের সক্ষমতা দেয়। পরিবর্তনশীল বিশ্বে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আজীবন শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে উদ্ভাবনী উদ্যোগের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
চলনবিলের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষাসেবা পৌঁছে দিতে সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার ভাসমান বিদ্যালয় প্রকল্প দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। বর্ষাকালে নদী-খাল ও জলাভূমিতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এলাকার শিশুদের জন্য নৌকাভিত্তিক শ্রেণিকক্ষ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। স্থানীয় নৌকা নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি এসব নৌকায় সৌরবিদ্যুৎ সংযোজন করা হয়েছে, যা শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করেছে।
বর্তমানে সংস্থাটি ৫৬টি নৌকা পরিচালনা করছে। এর মধ্যে ২৬টি ভাসমান শ্রেণিকক্ষ, ১০টি ভাসমান গ্রন্থাগার ও কম্পিউটার ল্যাব এবং ৮টি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা, খেলাধুলা ও পরিবহন কার্যক্রমেও ব্যবহৃত হচ্ছে বেশ কয়েকটি নৌকা।
সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ রেজোয়ান বলেন, স্থানীয় মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতেই টেকসই সমাধান গড়ে ওঠে। এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করা অসংখ্য মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টার স্বীকৃতি এবং ভবিষ্যতে আরও মানুষের কাছে পৌঁছানোর অনুপ্রেরণা।
এ বছর সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থার পাশাপাশি ন্যাশনাল অ্যাডাল্ট লিটারেসি এজেন্সি (নালা) এবং মরক্কোর শিক্ষা মন্ত্রণালয় ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা তরুণদের জন্য উদ্ভাবনী সাক্ষরতা কর্মসূচি বাস্তবায়নের স্বীকৃতি হিসেবে এ পুরস্কার দেওয়া হয়।
১৯৬৭ সাল থেকে ইউনেস্কো সাক্ষরতা ক্ষেত্রে উৎকর্ষ ও উদ্ভাবনের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার দিয়ে আসছে। চীন সরকারের অর্থায়নে প্রদত্ত ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কারের অর্থমূল্য ৩০ হাজার মার্কিন ডলার। এর আগে বাংলাদেশ থেকে ফ্রেন্ডশিপ ২০২৩ সালে এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন ২০১৩ সালে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছিল।
