ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

পুষ্প

সাতসিকার সহস্রবেলি

সাতসিকার সহস্রবেলি
×

বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার সাতসিকা গ্রামে ফুটেছে সহস্রবেলি- লেখক

মৃত্যুঞ্জয় রায়

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৮:৫০

| প্রিন্ট সংস্করণ

এবার ঈদের ছুটির একটা বেলা চমৎকার কাটল প্রখ্যাত পাখিবিদ ও লেখক শরীফ খানের বাড়িতে। বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার সাতসিকা গ্রামে তাঁর সুন্দর একতলা একটা পাকা বাড়ি। রাস্তার পাশে হলেও সে বাড়িতে ঘরের সামনে একটা ছোট্ট ফুলবাগান, আর পেছনে প্রায় ১০ বিঘা জমি ধরে গ্রামীণ বন। ফুলবাগানে রয়েছে বেশ কিছু বাহারি পাতা ও ফুলের গাছ। এগুলোর মধ্যে একটা বেশ বড়সড় এক ঝোপাল সহস্রবেলি ফুলের গাছ। নিভৃত ছায়াচ্ছন্ন গ্রামের ভেতর এ রকম একটি অভিজাত ফুলের গাছের দেখা পাব, ভাবিনি। 

শরীফ ভাই বললেন, ‘অবসরের পর এখন স্থায়ীভাবে এই গ্রামের বাড়িতেই থাকছি। তাই বাড়ির সামনে দু-চরটা ফুলগাছ লাগিয়েছেন আপনার ভাবি। রাতে বারান্দায় বসেও হাস্নাহেনা আর সহস্রবেলি ফুলের ঘ্রাণ পাই। তখন বুঝতে পারি ওসব গাছে ফুল ফুটেছে।’

সত্যিই চমৎকার সে ফুলের ঘ্রাণ। বেলি নামের ফুলগুলোর কড়া মিষ্টি ঘ্রাণ। সহস্রবেলি ফুল বেলি গোত্রের না হয়েও অমন নাম ধারণ করেছে মিষ্টি সৌরভের কারণেই। বেলি ফুলের মতো, অনেক ফুল একসঙ্গে বল বা খোঁপার মতো মঞ্জরিতে ফোটে বলে এর বাংলা নাম রাখা হয়েছে সহস্রবেলি বা হাজারীবেলি। 

এ গাছের ইংরেজি নাম কাশ্মেরি বুকেট। ফুলগুলো তোড়ার মতো গড়নে ফোটে বলে এরূপ নাম। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Clerodendrum chinense, প্রতিনাম Clerodendrum fragrans, আর গোত্র ভার্বেনেসি। অর্থাৎ এটি ভাঁটগোত্রের ফুল। এ গাছের পাতাগুলোও দেখতে ভাঁটগাছের মতো।

সহস্রবেলি একটি নরম কাণ্ডবিশিষ্ট বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় গাছ। এক থেকে দেড় মিটার লম্বা হয়। তবে শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে ঝোপ করে। মাটির নিচে শিকড় বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। সেসব শিকড় থেকে গাছ গজায়। কোথাও একবার জন্মালে তাকে সমূলে উৎপাটন করা কঠিন। এ জন্য এই গাছ কারও কারও কাছে আগাছা। কাণ্ড চৌকোণাকার, ডগার দিকটা সূক্ষ্ম পশমাবৃত। পাতা প্রায় পানপাতার মতো আকৃতির, বোঁটার কাছে গভীরভাবে খণ্ডিত বা হৃৎপিণ্ডাকার, অগ্রভাগ তীক্ষ্ণ, পাতার কিনারা সামান্য খাঁজকাটা। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে ডালের আগায় ফুল ফোটে।  

ফুল দেখতে অনেকটা গোলাপের মতো, কিন্তু ছোট ও গাদানো, রং সাদা থেকে মিষ্টি হালকা গোলাপি। থোকা ধরে ফুল ফোটে, কয়েক দিন ফুল সতেজ থাকে। বাসি হলে ফুল বিবর্ণ ও শুকিয়ে খয়েরি হয়ে যায়।
সহস্রবেলি গাছের অনেক ঔষধি গুণ আছে। সাধারণ সর্দি ও কাশি সারাতে সুপ্রাচীনকাল থেকে এর পাতা ও শিকড় দিয়ে চা বানিয়ে পান করার রেওয়াজ চলে আসছে। এ ছাড়া এই গাছ তার মূত্রবর্ধক গুণের জন্য সমাদৃত। মূত্রনালির সংক্রমণ কমাতে ও কিডনির পাথর অপসারণে এ গাছ ব্যবহার করা হয়। বিস্ময়কর এ গাছটি বিভিন্ন চর্মরোগ থেকেও মুক্তি দেয় বলে জানা গেছে। 

সহজে এ গাছের চারা পাওয়া যায়। মাটিতে শিকড় থেকে গজানো চারা সাবধানে তুলে লাগানো যায়। তাছাড়া ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে দিলেও তা থেকে গাছ হয়। বীজ থেকেও চারা হয়। তবে আধাশক্ত কাঠের শাখাকলম কাটিং করে চারা তৈরি করা সবচেয়ে ভালো।

এ গাছ টবে না লাগানো ভালো। মাটিতে লাগালে দ্রুত বাড়ে ও বেশি ফুল ফোটে। যেখানে পানি জমে না এ রূপ ছায়া জায়গায় এ গাছ ভালো হয়। এ গাছের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার আশ্চর্যজনক ক্ষমতা আছে। এ জন্য কম যত্নেও গাছ ভালো থাকে। এর ইংরাজি নামের সঙ্গে কাশ্মেরি  থাকলেও এটি আসলে চীনের গাছ। মতান্তরে এর আদি নিবাস নেপাল থেকে হিমালয়ের পূর্বাঞ্চল, আসাম ও আন্দামান এবং নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত। ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, পাকিস্তান, ভারত, কুক আইল্যান্ড এমনকি গ্যালোপোগোস দ্বীপেও এ গাছ আছে।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
 

আরও পড়ুন

×