ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১১ জুন ২০২৬

হাম ও উপসর্গ: চট্টগ্রাম

পিআইসিইউ পাচ্ছে না মুমূর্ষু শিশুরা

জরুরি মুহূর্তে পিআইসিইউ না পেয়ে কেউ কেউ মারা যাচ্ছে

পিআইসিইউ পাচ্ছে না মুমূর্ষু শিশুরা
×

চট্টগ্রামে বাড়ছে হামে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা। মুমূর্ষু শিশুর জন্য পিআইসিইউর প্রয়োজন হলেও না পেয়ে মারা যাচ্ছে অনেকে। চমেক হাসপাতালের হাম ব্লক থেকে তোলা- সমকাল

 শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬ | ০৮:৪৯ | আপডেট: ১১ জুন ২০২৬ | ০৯:২৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

হামের একাধিক উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় সাড়ে পাঁচ মাস বয়সী শিশু মিশকাতুর রহমানকে। এক দিনের মাথায় তার প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। সঙ্গে কমতে থাকে অক্সিজেনের মাত্রা। তাৎক্ষণিক পিআইসিইউ সাপোর্টের দরকার হয়। কিন্তু হাসপাতালে একটি পিআইসিইউও খালি নেই। মা-বাবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। চিকিৎসকদের কাছে বারবার আকুতি জানান। বেসরকারি হাসপাতালে যোগাযোগ করেও লাভ হয়নি। এক পর্যায়ে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হয় ছোট্ট মিশকাতুরকে। 

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে গত ৩১ মে এই ঘটনা ঘটে। শুধু মিশকাতুর নয়, তার মতো হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া অনেক শিশুই জরুরি মুহূর্তে পিআইসিইউ পাচ্ছে না। এতে কেউ কেউ মারা যাচ্ছে। 

পিআইসিইউতে (পেডিয়াট্রিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) গুরুতর অসুস্থ শিশুরা নিবিড় পর্যবেক্ষণ, উন্নত চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ তত্ত্বাবধানে থাকে। চট্টগ্রামে সরকারিভাবে পিআইসিইউ শয্যা আছে শুধু চমেক হাসপাতালে। পুরো বিভাগে হামে আক্রান্ত শিশুদের জন্য হাসপাতালের মাত্র ১৫টি শয্যাই একমাত্র ভরসা।

চমেক হাসপাতালের তথ্য বলছে, হাসপাতালটির শিশু বিভাগে ২০টি পিআইসিইউ শয্যা আছে। এর মধ্যে ১৫টি শয্যায় হাম আক্রান্ত শিশুদের রাখা হচ্ছে। বাকি পাঁচটি শয্যায় অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের রাখা হচ্ছে। হাসপাতালের ‘হাম ব্লকে’ সাধারণ ৫০ শয্যার বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৮০ জনের বেশি রোগী থাকছে। তাই একটি শয্যায় একাধিক শিশুকে রেখে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকরা। প্রতিদিন অন্তত ১০ শিশুর প্রয়োজন হয় পিআইসিইউ। কিন্তু শয্যাস্বল্পতার কারণে সব শিশুকে পিআইসিইউতে রাখা যাচ্ছে না। মুমূর্ষু শিশুকেও পিআইসিইউ দিতে পারছেন না চিকিৎসকরা। 

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে হাম ও উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫০ জনের বেশি শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। গত পাঁচ দিনে ভর্তি হয়েছে রেকর্ড ৩০১ শিশু। এর মধ্যে শুধু রোববার সর্বোচ্চ ৭১ জন এবং তার আগের দিন ৫৮ জন ভর্তি হয়। সোমবার ৫৭ জন এবং মঙ্গলবার ভর্তি হয় ৫৫ শিশু। গতকাল বুধবার ভর্তি হয় ৬০ জন। চট্টগ্রামের সরকারি হাসপাতালগুলোতে এ পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে দুই হাজার ৭৬৪ জন। চিকিৎসাধীন রয়েছে ২৮৩ শিশু। 

চমেক হাসপাতালে ৪ জুন রাতে সাড়ে ৯ মাসের শিশু আইমানের মৃত্যু হয়। তার বাবা মো. সোলেমান সমকালকে বলেন, ‘হামের একাধিক উপসর্গ থাকায় ছেলেকে প্রথমে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করি। এক দিনের মাথায় অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে চমেক হাসপাতালে নিই। এখানে ভর্তির কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তার শ্বাস-প্রশ্বাসে মারাত্মক সমস্যা শুরু হয়। তাৎক্ষণিক পিআইসিইউ শয্যার প্রয়োজন হয়। কিন্তু তখন একটি শয্যাও খালি ছিল না। পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে হন্যে হয়ে শয্যার খোঁজ করি। এক পর্যায়ে আমার আইমানের মৃত্যু হয়।’ 

সন্তান হারানো আরেক মা রেখা রানী। তিনি সমকালকে বলেন, ‘জ্বর আসার তিন দিনের ব্যবধানে আমার ৯ মাস বয়সী শিশুপুত্রের শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। সঙ্গে শুরু হয় তীব্র শ্বাসকষ্ট। প্রথমে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে এবং পরে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করি। অবস্থা গুরুতর হওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে পিআইসিইউর প্রয়োজন হয়। কান্নাকাটি করেও সন্তানের জন্য একটি শয্যা পাইনি। আইসিইউ পেলে আমার সন্তানের করুণ মৃত্যু হতো না।’ 

আরেক ভুক্তভোগী মো. ইমন হোসেন বলেন, ‘দুই দিন অপেক্ষার পরও সন্তানের জন্য পিআইসিইউ পাইনি। এক শিশুর মৃত্যুর পর শয্যাটি আমার সন্তানকে ডাক্তাররা দেবেন বলেছিলেন। কিন্তু আরেক শিশুর অবস্থা বেশি খারাপ হওয়ায় শয্যাটি তাকে দিয়ে দেওয়া হয়।’ 

চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা বলেন, ‘হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিন নতুন করে অনেক শিশু ভর্তি হচ্ছে। ৫০ শয্যার হাম ব্লকে ভর্তি থাকছে ৮০ থেকে ৯০ শিশু। এদের মধ্যে প্রতিদিন কারও না কারও জন্য প্রয়োজন হয় পিআইসিইউ সাপোর্ট। কিন্তু ১৫টি পিআইসিইউ শয্যা সব সময়ই রোগীতে পূর্ণ থাকছে। তাই কেউ সামান্য সুস্থ হলে বা কোনো শিশুর মৃত্যু হলে আরেক শিশুকে পিআইসিইউ সাপোর্ট দিতে পারছি আমরা।’ 

বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, ‘শারীরিক অবস্থা জটিল হওয়ায় বেশির ভাগ শিশুকেই টানা কয়েক দিন পিআইসিইউতে রাখতে হচ্ছে। যে কারণে শয্যা কখনও খালি থাকছে না। তার মধ্যে আর্থিক সংগতি না থাকায় অনেকে সন্তানকে বেসরকারি হাসপাতালে নিতে পারছেন না। বিষয়টি নিয়ে আমরাও বিব্রত।’

পিআইসিইউ শয্যার জন্য পরিচিত-অপরিচিত অনেকেই ফোন দেন চট্টগ্রামের চিকিৎসাপাড়ায় রোগীর বন্ধু হিসেবে পরিচিত সমাজকর্মী ম. মাহমদুর রহমান শাওনকে। জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, ‘দিনের বেলায় তো বটেই, মধ্যরাত ও ভোররাতেও অনেকের ফোন আসে। পিআইসিইউ শয্যার জন্য ফোন আসে বেশি। কিছুদিন ধরে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। কয়েক দিন আগে চমেক হাসপাতালে একটি শয্যার জন্য শত চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছি। দুই দিন পর শিশুটির মৃত্যু হয়।’ 

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) চট্টগ্রাম জেলার সভাপতি অশোক সাহা বলেন, হামে বহু শিশুর মৃত্যু জনমনে চরম উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করেছে। পিআইসিইউ শয্যার প্রবল সংকট, স্বাস্থ্যসেবায় সমন্বয়হীনতা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে পরিস্থিতি আরও নাজুক হচ্ছে। এ অবস্থায় সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। 

আরও পড়ুন

×