ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

ভাঙন ঝুঁকিতে ফসলি জমি স্কুল মসজিদ, রক্ষা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন

ভাঙন ঝুঁকিতে ফসলি জমি স্কুল মসজিদ, রক্ষা প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন
×

চারঘাটের পিরোজপুর এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধের চেষ্টা সমকাল

 চারঘাট (রাজশাহী) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

বর্ষা পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগে রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙন শুরু হয়েছে। উপজেলার গোপালপুর, চন্দনশহর, পিরোজপুর ও সাহাপুর এলাকার বিস্তীর্ণ ফসলি জমি এরই মধ্যে নদীতে বিলীন হতে শুরু করেছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় স্থাপনা এবং শত শত পরিবারের বসতভিটা।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এমন পরিস্থিতিতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) মাত্র ১০০ মিটার এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলার উদ্যোগ নিয়েছে, যা বিস্তৃত ভাঙনপ্রবণ এলাকার তুলনায় অপ্রতুল।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চারঘাট উপজেলার পদ্মা নদীতীরবর্তী প্রায় আট কিলোমিটার এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ থাকলেও প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা এখনও অরক্ষিত। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই এসব এলাকায় নদীভাঙন শুরু হয়। তখন জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি চোখে পড়ে না।
এ বছরও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে গোপালপুর ও পিরোজপুর এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে কয়েকশ বিঘা ফসলি জমির পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও নদীতে বিলীন হবে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড বিশেষ তহবিল থেকে প্রায় ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০০ মিটার এলাকায় ৯ হাজার ২০০টি জিও ব্যাগ ফেলার কাজ শুরু করেছে। কিন্তু স্থানীয়দের দাবি, ভাঙনপ্রবণ পুরো এলাকার তুলনায় এ উদ্যোগ অত্যন্ত সীমিত এবং এতে স্থায়ী কোনো সুফল মিলবে না।
গোপালপুর গ্রামের কৃষক বাদশা ইসলাম বলেন, ‘নদীর তীরে আমার ছয় বিঘা জমিতে পাট আবাদ করা ছিল। এরই মধ্যে দেড় বিঘা জমি নদীতে চলে গেছে। শুধু আমার নয়, এ এলাকার অধিকাংশ কৃষকের একই অবস্থা। গত বছরও লাখ লাখ টাকা খরচ করে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছিল, কিন্তু এবার আবার ভাঙন শুরু হয়েছে।’
পিরোজপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. নূর উদ্দিন শেখ বলেন, ‘যেখানে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে, এর মধ্যে আমাদের বিদ্যালয় পড়েনি। স্কুল থেকে নদীর দূরত্ব এখন মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিটার। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বিদ্যালয়টি নদীতে চলে যেতে পারে।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে জরুরি প্রকল্পের নামে জিও ব্যাগ ফেলা হলেও শুকনো মৌসুমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ বা নদীশাসনের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না। ফলে একই এলাকায় বারবার সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতায় ব্যবহৃত জিও ব্যাগে প্রতি বস্তায় ২৫০ কেজি বালু থাকার কথা। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অনেক বস্তায় নির্ধারিত পরিমাণ বালু নেই। এ ছাড়া ভারত সীমান্তসংলগ্ন চরাঞ্চল থেকে মাটিমিশ্রিত বালু সংগ্রহ করে বস্তা ভর্তি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা তাজমুল হক বলেন, ‘নদীর চর থেকে কেটে আনা বালুর সঙ্গে প্রচুর মাটি মিশে আছে। আবার সব বস্তায় সমান পরিমাণ বালু নেই। নিম্নমানের কাজ হলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে না।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চারঘাট উপজেলা শাখার সভাপতি মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকা বর্তমানে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। পুরো এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি নদীশাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন না করলে প্রতিবছর একই সমস্যা ফিরে আসবে এবং সরকারি অর্থেরও অপচয় হবে।’
অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান খাজা তারেক এন্টারপ্রাইজের প্রতিনিধি মিজানুর রহমান বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত কারিগরি মান অনুসরণ করেই করা হচ্ছে। বালুর মান ও বস্তার ওজন নিয়েও কোনো অনিয়ম নেই।’
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড রাজশাহী পওর বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আবু রৌশন মাস্উদ বলেন, ‘স্থানীয়দের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত ১০০ মিটার এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। তবে আশপাশের আরও অনেক এলাকা ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় রয়েছে।’
ইউএনও জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘নদীভাঙনের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে অবহিত করা হয়েছে। কাজের মান নিয়ে অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আরও পড়ুন

×