ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

ঢলনের বোঝা নিতে পারছেন না আমচাষি

ভালো ফলন হলেও আমের কাঙ্ক্ষিত দাম মিলছে না

ঢলনের বোঝা নিতে পারছেন না আমচাষি
×

চাঁপাইনবাবগঞ্জ- সোনামসজিদ মহাসড়কে আম বিক্রি করছেন এক চাষি। গতকাল শুক্রবার দুপুরে -সমকাল

 এ কে এস রোকন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৯:২৬ | আপডেট: ১৩ জুন ২০২৬ | ০৯:৪১

| প্রিন্ট সংস্করণ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার আমের বেশ ভালো ফলন হয়েছে। গাছভর্তি ফল দেখে ভালো লাভের আশায় ছিলেন চাষিরা। কিন্তু ঢলন প্রথাসহ নানামুখী চাপের কারণে কাঙ্ক্ষিত দাম পাচ্ছেন না তারা। এতে চাষিদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। 

স্থানীয় প্রশাসন বলছে, বিভাগীয় কমিশনারের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢলন প্রথা (প্রতি মণে ৪০ কেজির বদলে ১০ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত বেশি নেওয়া) বিলুপ্ত করা হয়েছে। তবে আড়তদারদের দাবি, সমঝোতার ভিত্তিতে ঢলন প্রথার মাধ্যমে আম কেনা হচ্ছে। চাষিরা বলছেন, তাদের জিম্মি করে ঢলন নেওয়া হচ্ছে।  
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমের রাজধানী হিসেবে খ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান এবং দেশের সর্ববৃহৎ আম বাজার কানসাট। চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-সোনা মসজিদ আঞ্চলিক সড়কসহ বাজারটির চারপাশের সড়কগুলো আমে ভরপুর। অধিক লাভের আশায় এই জেলা বাদে দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁর সাপাহারসহ বিভিন্ন এলাকার আমও এখানে আসে। কিন্তু উৎপাদন পর্যায়ে বাড়তি খরচের সঙ্গে এখন ঢলন ও খাজনার বোঝা চেপে বসেছে চাষির ওপর । 

চাষিদের অভিযোগ, গত বছরের তুলনায় এবার অনেক জাতের আমের দাম প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। তার ওপর প্রতি মণ আমের সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত ঢলন দিতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে রাজশাহী বিভাগের আম-সংশ্লিষ্টদের নিয়ে সভায় কেজি দরে আম কেনার সিদ্ধান্ত হলেও জেলার আম বাজারগুলোতে এখনও চালু হয়নি। রাজশাহীর বাজারগুলোতে প্রতি মণে চার থেকে পাঁচ কেজি, নওগাঁর সাপাহারে আট কেজি নেওয়া হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১০-১৫ কেজি ঢলনে আম কিনছেন ফরিয়ারা। পাশাপাশি এবার শতকরা ২৫ ভাগ বেশি খাজনা দিতে হচ্ছে চাষিদের। অনেক ক্ষেত্রে তিনবার পর্যন্ত খাজনা আদায় করা হচ্ছে। 

কানসাট বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে লক্ষণভোগ, বিভিন্ন ধরনের গুটি, গোপালভোগ, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ব্যানানা, বারি-৪, সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন জাতের আম নামলেও আশানুরূপ দাম পাচ্ছেন না চাষিরা। বাজারে প্রতি মণ গোপালভোগ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। লক্ষণভোগ ৬৫০ থেকে ৮৫০, ক্ষীরসাপাত ১ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০, আম্রপালি ও ল্যাংড়া ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০, ব্যানানা ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার এবং রানীপ্রসাদ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
চককীত্তির আমচাষি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এ বছর আমের ফলন ভালো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত গরমে মানুষের আম কেনার আগ্রহ কিছুটা কমে গেছে।  পাঁচ বছর ধরে ঢলন প্রথাসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে আমরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। এই লোকসান আমরা নিতে পারছি না।’

কানসাটের আম বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম জানান, যতবার আন্দোলন হচ্ছে ততবার চাষিরা জিম্মি হচ্ছে। ২০ বছর আগে ৪৩ কেজিতে আম কেনা-বেচা হলেও গত ১০ বছর থেকে আমের ভরা মৌসুমে আন্দোলনের তালে তালে ৪৩ কেজি থেকে বাড়তে বাড়তে এখন ৬০ কেজিতে মণ গিয়ে ঠেকেছে। 
আমের আড়তদার মেহেরুল ইসলাম জানান, ওজন জটিলতা নিয়ে প্রায় ১০ বছর ধরে আন্দোলন হচ্ছে। প্রতিবারই ভরা মৌসুমে একটি গোষ্ঠী আন্দোলন করে। অন্তত চার দফা উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে ৪০ কেজিতে মণ ধরে বা কেজি দরে আম কেনাবেচার কথা বলা হলেও কোনো ক্ষেত্রে চাষি আবার কোনো ক্ষেত্রে আড়তদারদের অনীহার কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। এতে চাষি, ব্যবসায়ীসহ আম-সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। সারা দেশে সরকার এক ওজন নীতি আনলে আড়তদাররা সে নীতিকে স্বাগত জানাবে।
কানসাট আম ব্যবসায়ী রায়হান আলী জানান, এ বছর আম বাজারটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ১ কোটি টাকা কমে লিজ পেয়েছেন ইজারাদার। অথচ শতকরা ২৫ ভাগ খাজনা আদায় করছেন। কুরিয়ার সার্ভিসে আম বুকিং দিতে গেলেও খাজনা বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।

কানসাট আম বাজারের ইজারাদার মো. আলমগীর জুয়েল জানান, পুলিশ, আনসার ও নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবকসহ প্রায় ৫০ জন যানজট নিরসন ও চাষিদের আম বাজারে সহজে আনতে কাজ করছেন। অতিরিক্ত কোনো খাজনা নেওয়া হচ্ছে না। কোথাও কোনো ব্যক্তির কাছে তিনবার খাজনা আদায় বা কুরিয়ারের সামনে কোনো খাজনা আদায় হচ্ছে না। যদি এমন অভিযোগ আসে, তবে প্রশাসনকে জানানোর পরামর্শ দেন তিনি। 

কানসাট আম আড়তদার সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক টিপু জানান, ঢাকা থেকে খালি ক্যারেট আনলেও এর খাজনা নিচ্ছে। চাষি আম বিক্রির সময় একবার, আড়তে একবার এবং কুরিয়ারে বুকিং দেওয়ার সময় আরও একবার খাজনা নিচ্ছে। আর আমের ভরা মৌসুমে একটি গোষ্ঠী আম কাঁচামাল হওয়ার পরও অযৌক্তিক ৪০ কেজিতে মণ ধরে আম কেনা বেচার আন্দোলনের গ্যাঁড়াকলে ফেলে আম বাজারের পরিবেশ অস্থিতিশীল করছে। তাঁর দাবি চাষিদের সমঝোতার ভিত্তিতেই ঢলন প্রথার মাধ্যমে আম কেনা হচ্ছে। 
জেলার শিবগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম জানান, সরকারি রেট মেনে বাজারে তালিকা টেনে ইজারাদার খাজনা আদায় করছে। কুরিয়ারের সামনে বা তিনবার খাজনা আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে ইজারাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিভাগীয় কমিশনারের সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক ঢলন প্রথা বিলুপ্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত আম নেওয়ার কোনো অভিযোগ চাষিরা করলে অভিযুক্ত আড়তদারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলন ভালো হলেও বাজারে চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত সরবরাহ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। তবে বর্তমানে আমের দামে কৃষক লোকসানে পড়বে না। আমের রপ্তানিসহ বহুমুখী ব্যবহার বাড়াতে পারলে চাষিরা নায্য মূল্য পাবেন। 
 

আরও পড়ুন

×