সরকারি অ্যাম্বুলেন্স ১৩ মাস বন্ধ, বেসরকারি ব্যবসা রমরমা
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের গ্যারেজে অবহেলায় পড়ে থাকা সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সমকাল
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৬ | আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ | ০৮:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
জেলার প্রায় ২৭ লাখ মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতাল। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা আর বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের কারসাজিতে দীর্ঘ ১৩ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে এখানকার সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সেবা।
এমন অবস্থায় জরুরি ও মুমূর্ষু রোগীদের সিলেট বা ঢাকায় রেফার করা হলে, বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চড়া ভাড়া মেটাতে গিয়ে পকেট খালি হচ্ছে সাধারণ মানুষের। অন্যদিকে, সরকারি সেবা বন্ধ থাকলেও গাড়ি না চালিয়েই মাসের পর মাস নিয়মিত বেতন তুলে নিচ্ছেন হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তিনটি অ্যাম্বুলেন্সের সবক’টিই এখন পুরোপুরি বিকল।
১৯৯৩ সালে প্রথম হাসপাতালে আসা নতুন অ্যাম্বুলেন্সটি দুর্ঘটনার পর অচল হয়ে পড়ে। এরপর ২০১৩ সালের দিকে একটি পুরাতন অ্যাম্বুলেন্স আনা হলেও সেটিও পরে বিকল হয়ে যায়। দীর্ঘদিন জোড়াতালি দিয়ে চালানোর পর ২০২৫ সালের মে মাসে বিআরটিএ হাসপাতালের সবক’টি অ্যাম্বুলেন্সকে আনুষ্ঠানিকভাবে অকেজো ঘোষণা করে। এর ৯ মাস পর, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে গোলাপগঞ্জ থেকে ২০ বছরের পুরোনো আরেকটি অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে আসা হয়। তবে মনে হয় অদৃশ্য কোনো ইশারায় গাড়িটির মেরামতের কাজ শেষ হতে চাচ্ছে না। এভাবেই কেটে গেছে চার মাস। অভিযোগ রয়েছে একটি চক্র বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করছে; যাতে প্রয়োজনের সময় বাড়তি টাকায় বেসরকারি বা প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে বাধ্য হন সেবাগ্রহীতারা। তাছাড়া একটি সিন্ডিকেটের আওতায় থাকায় যে ভাড়া হাঁকেন চালকরা অন্যরা তার নিচে নামেন না। এভাবেই প্রতিদিন রোগীর অসহায় স্বজনদের জিম্মি করে চলছে চক্রের কার্যক্রম।
সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে সুনামগঞ্জ থেকে সিলেট বা ঢাকায় রোগী বহনে খরচ হয় এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে এক হাজার ৭০০ টাকা। একই কাজে একই দূরত্বের জন্য বেসরকারি/প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সে রোগী পরিবহনের জন্য ভাড়া নেওয়া হয় তিন হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা; যা প্রায় ছয় থেকে সাত গুণ বেশি।
তাহিরপুর থেকে আসা রোগীর স্বজন হাছিনা বেগম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাঁর চাচাতো ভাইয়ের ছেলে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত। সরকারি গাড়ি নেই বলে জানানো হয়েছে। বাধ্য হয়ে ৩ হাজার ৫০০ টাকায় প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করেছেন। সরকারি গাড়ি থাকলে অর্ধেক টাকায় হতো। সিন্ডিকেট করে টাকা বেশি নেওয়ার জন্যই তারা সরকারি গাড়ি সার্ভিসে আনতে দেয় না।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সরকারি অ্যাম্বুলেন্সের চালকের দাবি, গোলাপগঞ্জ থেকে আনা গাড়িটির মেরামত কাজ চলছে। আগামী ১০ থেকে ১৫ দিনের মধ্যে তা সচল হবে। তাদের এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সরেজমিনে হাসপাতালের গ্যারেজে খোঁজ নেওয়া হয়। সেখানে কর্তৃপক্ষের এমন দাবির সত্যতা মেলেনি। গ্যারেজ খুলতেই দেখা যায় ধুলো-বালির আস্তরে ঢাকা দুটি অ্যাম্বুলেন্স অবহেলায় পড়ে আছে। যে গাড়িটির মেরামত কাজ চলছে বলে জানানো হয়েছে, মূলত সেটির কোনো কাজই করা হচ্ছে না। মাসের পর মাস এভাবেই গাড়ি দুটি হাসপাতালের গ্যারেজে রেখে সচেতনভাবে দেওয়া হচ্ছে মিথ্যা তথ্য।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক বাসিন্দা অভিযোগ করে বলেন, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স বন্ধ রাখাটা আসলে সেবাপ্রত্যাশীদের জিম্মি করে বেসরকারি গাড়ি চক্রের বাজার ধরে রাখা ও বাড়তি টাকা কামানো। বেশি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটা চক্রান্ত। হাসপাতালের কিছু অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এই সিন্ডিকেট চলছে। তারা ইচ্ছে করেই সরকারি অ্যাম্বুলেন্স অযত্নে ফেলে রেখেছে, যাতে প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্সগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করতে পারে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালক মুহিতুল ইসলাম বলেন, তিনটি অ্যাম্বুলেন্সই অকেজো হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে রোগীদের সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। গোলাপগঞ্জ থেকে আনা পুরোনো অ্যাম্বুলেন্সটির মেরামত কাজ চলছে। কাজ শেষ হলে রোগীদের সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স অকেজো হওয়াতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সেবা বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এই মুহূর্তে নতুন কোনো অ্যাম্বুলেন্স স্টকে না থাকায় বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে না। তবে অন্যত্র থেকে আনা গাড়িটির মেরামত কাজ চলছে, আশা করি কিছুদিনের ভেতরেই সেটি চালু করা যাবে।
- বিষয় :
- হাসপাতাল
- সুনামগঞ্জ
- অ্যাম্বুলেন্স