পঞ্চগড়
পুশইন আতঙ্কে বিজিবির সঙ্গে সীমান্ত পাহারায় স্থানীয়রা
পঞ্চগড় সদর উপজেলার মিরগড় সীমান্ত এলাকায় ১৮-বিজিবি ব্যাটালিয়ন সদস্যরা সতর্ক পাহারায়। ছবি- সমকাল
পঞ্চগড় প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ১৪:৩৬ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ১৪:৫০
দিনভর পরিশ্রমের পর রাতে বিশ্রামে যাওয়ার কথা সীমান্তবর্তী জনপদের মানুষের। তবে পঞ্চগড়ের অনেক সীমান্ত গ্রামে এখন ভিন্ন চিত্র। গভীর রাতেও অলিগলি, ফসলের মাঠ ও সীমান্তঘেঁষা পথগুলোতে দেখা যায় মানুষের টহল। কারও হাতে লাঠি, কারও হাতে টর্চলাইট, সঙ্গে রয়েছে বাঁশি ও হ্যান্ড মাইক। সন্দেহজনক কোনো গতিবিধি নজরে এলেই দ্রুত সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে চারদিকে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির পাশাপাশি রাত জেগে পাহারা দিচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারাও।
সম্প্রতি পঞ্চগড়-১৮ বিজিবির দায়িত্বপূর্ণ সদর উপজেলার মীরগড় সীমান্ত এলাকায় গিয়ে এমন চিত্র দেখা গেছে। সীমান্তবাসীদের দাবি, ভারতের সঙ্গে প্রায় ২৮৪ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তঘেরা এ জেলায় নতুন করে পুশইনের আশঙ্কা দেখা দেওয়ায় উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নেই কিংবা নজরদারি তুলনামূলক দুর্বল, সেসব এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন তারা।
পঞ্চগড়ের ভৌগোলিক অবস্থান সীমান্ত নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, নদী, খাল ও জনবসতি নিয়ে গঠিত দীর্ঘ সীমান্ত এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা চ্যালেঞ্জিং। ফলে অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের আশঙ্কা দেখা দিলে সীমান্ত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
মীরগড় সীমান্তে সরেজমিনে দেখা গেছে, বিজিবি সদস্যদের টহলের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাহারায় অংশ নিচ্ছেন। দিন-রাত তারা সন্দেহজনক ব্যক্তিদের গতিবিধির ওপর নজর রাখছেন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত বিজিবিকে খবর দিচ্ছেন। একই চিত্র দেখা গেছে জেলার অন্যান্য সীমান্তবর্তী এলাকাতেও।
দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া, আটোয়ারী, বোদা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা ভারতীয় সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ এই সীমান্ত এলাকায় দায়িত্ব পালন করছে নীলফামারি-৫৬, ঠাকুরগাঁও-৫০ এবং পঞ্চগড়-১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়ন। তবে কাঁটাতারের বেড়াবিহীন কিছু অংশ এবং জনবল সংকটের কারণে পুরো সীমান্তে একযোগে নজরদারি বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, গ্রাম পুলিশ ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে কয়েকটি এলাকায় অনানুষ্ঠানিক পাহারা দলও গঠন করা হয়েছে।
সীমান্তবাসীদের ভাষ্য, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে কয়েক দফায় পুশইনের ঘটনা ঘটেছিল। তাদের দাবি, সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর আবারও পুশইনের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত বছরের মে মাস থেকে তিন মাসে ১১ দফায় নারী ও শিশুসহ ১৬৬ জনকে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। পরে বিজিবি ও পুলিশের তৎপরতায় তাদের পরিচয় শনাক্ত করে অধিকাংশকে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সম্প্রতি নীলফামারি-৫৬ বিজিবির আওতাধীন সদর উপজেলার বড়বাড়ি সীমান্ত দিয়ে নারী-শিশুসহ ১০ জনকে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে বিএসএফ। স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিজিবি বাধা দিলে তারা সীমান্তের শূন্যরেখায় অবস্থান নেয়। পরবর্তীতে একাধিক পতাকা বৈঠকের পর তিনদিনের মাথায় বিএসএফ তাদের ভারতে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
বোদা উপজেলার ময়দানদীঘি ডিগ্রি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারী প্রভাষক শেখ সাজ্জাদ বলেন, পুশইনের মতো ঘটনা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয় নয়, এটি সামাজিক ও কূটনৈতিক সংকটও তৈরি করতে পারে। একটি দেশের নাগরিককে জোরপূর্বক অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। এ ধরনের সমস্যার সমাধান দুই দেশের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমেই হওয়া উচিত।
মীরগড় এলাকার বাসিন্দা ফয়জুল ইসলাম বলেন, আগে সারাদিন কাজ শেষে নিশ্চিন্তে ঘুমাতাম। এখন সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে অনেকেই রাত জেগে পাহারা দিচ্ছি। সন্দেহজনক কাউকে দেখলেই বিজিবিকে খবর দিচ্ছি।
হাড়িভাসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইয়েদ নূর-ই-আলম বলেন, সীমান্তে পুশইনের ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের তৎপরতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সীমান্তে কোনো সমস্যা হলে প্রথম ভোগান্তিতে পড়েন এখানকার মানুষ। তাই স্থানীয়দের সহযোগিতায় বিজিবির সঙ্গে সমন্বয় করে পাহারা দেওয়া হচ্ছে।
পঞ্চগড় ১৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের মিরগড় কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার মো. আক্তারুজ্জামান জানান, আমাদের ১৮ বিজিবির দায়িত্বপুনর্ণ এলাকায় এজাবত কোন পুশইনের ঘটনা ঘটেনি। স্থানীয়দের ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি আরও বলেন, এই প্রচেষ্টাতে স্থানীয়রা যে সহযোগিতা করছেন। সীমান্তে যেকোন অবৈধ পারাপার বা যেকোন অপরাধমুলক কর্মকান্ড আমাদের দ্রুত জানাতে পারেন। আমরা সবাই সীমান্তে সজাগ আছি। আমরা যেকোন পদক্ষেপে সীমান্তে অপরাধ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবো ইনশাল্লাহ।
