২১ প্রাণহানির পরও থামেনি পাহাড় কাটা
রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় পাহাড়ের মাটি কেটে নিয়েছেন প্রভাবশালীরা। সম্প্রতি চন্দ্রঘোনা এলাকায় সমকাল
রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬ | ০৮:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
২০১৭ সালের ১৩ জুন। ভোরের আলো ফোটার আগেই অতিবর্ষণ ও ভয়াবহ পাহাড়ধসে লন্ডভন্ড হয়ে যায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার রাজানগর ও ইসলামপুর ইউনিয়ন। মাটির নিচে চাপা পড়ে নিভে যায় চার পরিবারের ২১টি প্রাণ। একই বছরের ডিসেম্বরে পাহাড় কাটার সময় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। সেই মর্মান্তিক ঘটনার ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও রাঙ্গুনিয়ায় থামেনি পাহাড় কাটা, কমেনি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি।
প্রতি বর্ষায় পাহাড়ের পাদদেশে ও চূড়ায় বসবাসকারী হাজারো মানুষের মনে ফিরে আসে আতঙ্কের সেই স্মৃতি। এরপরও পাহাড়ে এখনও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি, চলছে পাহাড় কাটা। ২০১৭ সালে পাহাড়ে ২১ হাজার লোকের বসতি ছিল। বর্তমানে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজারে। এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর উপপরিচালক মোজাহিদুর রহমান। প্রতি বর্ষায় পাহাড়ে বসবাস বন্ধে মাইকিং আর সতর্কবার্তা থাকলেও নেই স্থায়ী সমাধান। স্থানীয়দের প্রশ্ন– আরেকটি ভয়াল ১৩ জুনের জন্যই কি অপেক্ষা করছে রাঙ্গুনিয়া?
২০১৭ সালের ১৩ জুন ভোরে পৃথক চারটি পাহাড়ধসের ঘটনায় রাজানগরের বগাবিলী টাইক্যাঘোনা এলাকায় একই পরিবারের চারজন, বালুখালী এলাকায় আরও চারজন, ইসলামপুরের মইন্যারটেকে এক দম্পতিসহ পাঁচজন এবং পাহাড়তলীঘোনায় আটজন প্রাণ হারান। কয়েক মাস পর ডিসেম্বরে পাহাড় কাটার সময় মাটিচাপায় মারা যান আরও তিনজন।
উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাঙ্গুনিয়ার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা এলাকায় প্রায় ২৪ হাজার একর পাহাড় ও বনভূমি রয়েছে। এসব পাহাড়ের চূড়া ও পাদদেশে গড়ে উঠেছে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার পরিবারের বসতি। সেখানে অন্তত ২৫ থেকে ৩০ হাজার মানুষ মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ইছাখালীর গুচ্ছগ্রাম, জাকিরাবাদ, কাদেরনগর, নোয়াগাঁও, জঙ্গল বেতাগী, রিজার্ভপাড়া, বগাবিলি, মোহাম্মদপুর, লেলিঙ্গার টিলা, মঘাইছড়ি, চাঁদের টিলা, নিশ্চিন্তাপুর, ফকিরারটিলা, বনগ্রাম, জঙ্গল পারুয়াসহ ৩০ থেকে ৩৫টি এলাকা।
বর্ষা মৌসুম এলেই উপজেলা প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ছাড়ার জন্য মাইকিং করা হয়। কিন্তু নিরাপদ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ মানুষ সরে যান না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের যোগসাজশে বছরের পর বছর পাহাড় কেটে অবৈধ বসতি গড়ে উঠেছে। অথচ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে সরিয়ে নেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায় না।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ছোটখাটো ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ের পাদদেশে থাকা পরিবারগুলোর মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। সচেতন মহলের আশঙ্কা, কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আবারও ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের ইছামতী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. তোহিদুর রহমান বলেন, বৃষ্টির সময় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উচ্ছেদ করার পরও অনেকে আবার বসতি গড়ে তোলেন। লোকবলের অভাবে এককভাবে এ কাজ কঠিন হয়ে পড়েছে। কোথাও পাহাড় কাটার খবর পেলেই উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
ইউএনও নাজমুল হাসান বলেন, পাহাড় কাটা রোধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ বসবাসকারীদের সচেতন করা হচ্ছে। তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য পুনর্বাসন পরিকল্পনা ও উচ্চপর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
- বিষয় :
- পাহাড়
