ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

লাম্পি রোগ ও আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে লোকসানে চামড়া ব্যবসা

লাম্পি রোগ ও আন্তর্জাতিক সনদের অভাবে লোকসানে চামড়া ব্যবসা
×

নাটোর শহরের চকবৈদ্যনাথ এলাকায় আড়তে চলছে চামড়া প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের কাজ সমকাল

 নাটোর সংবাদদাতা

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

গেল কোরবানি ঈদের সময় লাভের আশা নিয়েই এক হাজার ১০০ পিস গরুর চামড়া কিনেছিলেন ঢাকার চামড়া ব্যবসায়ী সবুজ মিয়া। এর মধ্যে লাম্পি রোগে আক্রান্ত কিছু পশুর চামড়া থাকায় লাভের স্বপ্ন ভেস্তে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ের ছোট ব্যবসায়ীদের এমন আশা ভঙ্গ এবং ট্যানারিগুলোর আন্তর্জাতিক সনদ না পাওয়ার কারণে ধসে যাচ্ছে চামড়াশিল্প।
সাভারের ওই ব্যবসায়ী জানান, সংগ্রহ করা পশুর চামড়া পরিষ্কার করে লবণ দিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করে নাটোরের আড়ত হয়ে নিয়ে যান ঢাকার সাভারে। শ্রমিক ও পরিবহন খরচসহ প্রতি পিস চামড়ায় তাঁর গড় খরচ পড়েছিল ৯০০ টাকা। কিন্তু আড়তে আনার পর লাম্পি রোগে আক্রান্ত হওয়ার চিহ্ন থাকায় সাড়ে ৩০০ পিস চামড়া মাত্র ৩০০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হন। বাকি ৭৫০ পিস বিক্রি হয় এক হাজার ১০০ টাকা দরে। ফলে ১১ লাখ টাকা পুঁজি খাটিয়ে তাঁর মোট বিক্রি দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ৩০ হাজার টাকা। এক মৌসুমেই বড় অঙ্কের লোকসান গুনে এ ব্যবসা থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

সবুজ মিয়ার মতো নাটোরের ঐতিহ্যবাহী চামড়ার বাজারে এসে এমন লোকসানের কথা জানিয়েছেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আরও অনেক চামড়া ব্যবসায়ী। পাবনার চাটমোহরের মিলন চন্দ্র দাস ও আশুলিয়ার অরুণ কুমার দাস জানান, চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ, শ্রমিক ও পরিবহন ব্যয় আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। অথচ বাজারে ক্রেতাসংকট ও ‘লাম্পিং’ রোগের কারণে চামড়ার প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
পাবনার অন্য ব্যবসায়ী রাজু সরকার বলেন, সরকার নির্ধারিত দামের কথা বিবেচনা করে ৭০০ পিস চামড়া কিনেছিলাম। কিন্তু বিক্রি করতে গিয়ে সেই দাম পাইনি। পরিবহন ও লবণের খরচ যোগ করে এবার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেল।

গবাদি পশুর লাম্পিং রোগ নিয়ে নাটোর জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তা মো. সেলিম উদ্দীন বলেন, জেলায় পশুর লাম্পি রোগের টিকা প্রদান চলমান রয়েছে। অতিরিক্ত গরমে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বাড়ে আবার ঠান্ডার সময়ে কমে। জেলায় যেসব শিক্ষিত খামারি রয়েছেন, তাদের সবাই নির্দিষ্ট সময়ে পশুকে লাম্পি রোগের টিকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। অনেকে আছেন, যারা পশুকে কোনো রোগের টিকাই দিতে চান না। তাদের পশুই মূলত এ রোগে আক্রান্ত হয়। এর প্রভাব চামড়া শিল্পেও পড়ছে।
আড়তদার রকিব উদ্দিন জানান, মৌসুমী ব্যবসায়ীরা সাধারণত এতিমখানা ও মাদ্রাসা থেকে চামড়াগুলো গড়ে কেনেন। সেখানে ছোট ও রোগাক্রান্ত চামড়া আলাদা করার সুযোগ থাকে না। আড়তে আসার পর ছোট-বড় ও ভালো-মন্দ যাচাই করে আলাদা দামে বিক্রি করতে হয়। চামড়া চিনে না কিনলে ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়ছেন।
নাটোরের পাইকারি চামড়া ব্যবসায়ী লুৎফর রহমান জানান, বাজারে ছোট ও সাধারণ চামড়া ২০০ থেকে ৮০০ টাকা এবং ভালো মানের চামড়া ৯০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত কেনাবেচা হয়েছে। লাম্পি রোগে ক্ষতিগ্রস্ত পশুর চামড়া ভালো দামে বিক্রির সুযোগ নেই।

উত্তরাঞ্চলের চামড়া শিল্প ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উল্লেখ করে তিনি বলেন, হাজারীবাগ থেকে সাভারের হেমায়েতপুরে ট্যানারি স্থানান্তরের পর এখনও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে ট্যানারিগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘এলডব্লিউজি’ সনদ পাচ্ছে না। এই সনদের অভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বড় ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনা কমিয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে স্থানীয় বাজারে।
জেলা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম খান সিদ্দিকী জানান, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগসহ দেশের প্রায় ৩০টি জেলা থেকে নাটোরে লবণযুক্ত কাঁচা চামড়া আসে। কাটাছেঁড়া বা রোগাক্রান্ত চামড়ার দাম পাওয়া যায় না বলে তা বাদ দিয়ে হিসাব করতে হয়।
সমিতির সভাপতি সায়দার রহমান খান বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার চামড়ার আমদানি কিছুটা কম। এ বছর ১২ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও এখন পর্যন্ত অর্ধেকের কিছু বেশি এসেছে। 
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের চামড়াশিল্পকে টেকসই করতে হলে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রপ্তানি পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় সরকারি তদারকি ও সমন্বয় প্রয়োজন।  না হলে প্রতি বছরই ব্যবসায়ীরা ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
 

আরও পড়ুন

×