প্রাথমিক শিক্ষা: চূড়ান্ত দুর্দশা
অনিশ্চয়তায় চরাঞ্চলের শিশুদের শিক্ষা
আশপাশের নিচু জমি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যায়। এরই মাঝে দাঁড়িয়ে আছে ৭৯ নম্বর চর জহির উদ্দিন রেড ক্রিসেন্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টিনের স্থাপনা। ১১ জুন ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার চর ফারজানা এলাকায় - সমকাল
নাসির লিটন, ভোলা
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৭:৫৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
চলতি বছর তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে রিপা বেগম। ক্লাসে তার রোল নম্বর ১। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, নতুন শ্রেণিতে গত ১১ জুন পর্যন্ত কোনো ক্লাসই করতে পারেনি শিশুটি। এদিন ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার পূর্ব বিশারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গেলে রিপাসহ অন্য কয়েক শিক্ষার্থীর অভিভাবকেরা এই তথ্য জানান। সোনাপুর ইউনিয়নে অবস্থিত নাগর পাটোয়ারীর চরের এই বিদ্যালয়ে একমাত্র শিক্ষক মো. বাবলুই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।
রিপার ভাষ্য, তাকে ইংরেজি-অঙ্ক পড়ানোর মতো কেউ নেই। নিজে কিছু বাংলা গল্প-কবিতা পড়ে, কিন্তু ইংরেজি পড়তে পারে না। একই তথ্য জানিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির তামান্না বেগম বলল, ‘বাবলু স্যার কয় দিন পরপর স্কুল আইলেও ক্লাস করে নাই।’
৭৫ শিক্ষার্থীর এই বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. বাবলু মাঝেমধ্যে মিডডে মিল বিলি করতে আসেন বলে জানান নাগর পাটোয়ারীর বাজারের ব্যবসায়ী নোমান হাওলাদার। তাঁর অভিযোগ, ছাত্রছাত্রী না এলে পাশের মাদ্রাসায় এসব বিতরণ করেন শিক্ষক মো. বাবলু। বাকিগুলো কিছু লোকের সঙ্গে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেন। একই ইউনিয়নের মোহাম্মদ ভেলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন মেঘনায় বিলীন হওয়ার পর স্থাপন করা হয়েছে চর লাদেনে। তিন কক্ষের টিনের স্থাপনা এখানে। মোট শিক্ষার্থী ৬৬ জন। ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রনি কর্মকার ছাড়া আরেকজন শিক্ষক আছেন। কেউ ছুটিতে গেলে অন্যজনকে সব সামলাতে হয়।
৭৯ নম্বর চর জহির উদ্দিন রেড ক্রিসেন্ট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টির স্থাপনা টিনের। খোলা মাঠের চারপাশে নিচু জমি। সেখানে ১১ জুন ক্লাস নিচ্ছিলেন মো. শাকিল। তিনি জানান, একমাত্র শিক্ষক রকিবুল ইসলাম সম্মানীর বিনিময়ে তাঁকে দিয়ে ক্লাস করান।
বিদ্যালয় ভবনে আবাসন
চাঁদপুর ইউনিয়নের চর মোজাম্মেলের পশ্চিম রামদেবপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি ভবন। একটিতে শ্রেণি কার্যক্রম চলছে। এলাকাবাসী জানায়, দোতলা অন্য ভবনটি জলদস্যু ছালাউদ্দিন ডাকাত ও তাঁর সহযোগীদের দখলে। সেখানে খাট-চৌকি বসিয়ে দিনরাত চলে আড্ডাবাজি ও মাদক সেবন। এ বিষয়ে গত ২৬ এপ্রিল উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে লিখিত দিয়েছেন বলে জানান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মঞ্জুরুল ইসলাম।
চর মোজাম্মেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় তলার কক্ষে বসবাস সাত-আটজনের। তাদের মধ্যে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছালেক আহমেদ ও আল আমিন বলেন, থাকার নিরাপদ ব্যবস্থা না থাকায় তারা বাধ্য হয়ে এই কক্ষ ব্যবহার করছেন। আরেকটি কক্ষে থাকছেন প্রাথমিকের শিক্ষকেরা।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুমন চন্দ্র দাস বলেন, আগে কয়েকজন শ্রেণিকক্ষে থাকেন। ১১৯ জন শিক্ষার্থীর জন্য চারজন শিক্ষক আছেন। সরেজমিনে তিনি ছাড়া কাউকে পাওয়া যায়নি।
প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রিয়াজ আলমের দেওয়া তথ্যমতে, উপজেলায় ১১০টি বিদ্যালয়ের প্রায় ১২ হাজার শিক্ষার্থী। প্রধান শিক্ষকের ৪০টি পদ ও সহকারী শিক্ষকের ৭৯টি পদ শূন্য। এর মধ্যে মেঘনার চর মোজাম্মেল ও চর জহির উদ্দিনে ১০টি বিদ্যালয়ে আছে ৫৯টি পদ। কর্মরত আছেন ২৯ শিক্ষক। এসব চরে শিক্ষার্থী মাত্র ৭৬৬ জন। দুর্গম এলাকা হওয়ায় সবসময় তদারকি সম্ভব হয় না।
জেলার চরাঞ্চলে ৪৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৮ হাজার ৫২১ জন। এ তথ্য জানিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বলেন, দখলদারদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
- বিষয় :
- শিক্ষা