রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
হল উদ্বোধনের আগেই ফাটল, ঠিকাদার ‘বালিশকাণ্ডের’
ভবনে ফাটলের বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন
নির্মাণ শেষে হস্তান্তরের আগেই ফাটল দেখা দেয় বিজয়-৭১ হলে। পরীক্ষার জন্য পলেস্তারা খোলা হয়েছে। গতকাল দুপুরে তোলা- সমকাল
সৌরভ হাবিব ও মাইনুল ইসলাম রাজু, রাজশাহী
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ০৮:৪১ | আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ | ১০:৪২
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন ১০ তলাবিশিষ্ট বিজয়-৭১ হল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের আগেই বিভিন্ন দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। এই ভবনটির নির্মাণকাজ করছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আলোচিত ‘বালিশকাণ্ডের’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স অ্যান্ড কোম্পানি। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভবনে ফাটল বিষয়ে গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।
এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে এই হলেরই মিলনায়তনের ছাদ ঢালাই শেষে ধসে পড়েছিল। এতে ১২ শ্রমিক আহত হয়েছিলেন। তখন উঠে আসে নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি ও নির্মাণকাজের নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি।
এ ছাড়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের বহুতল চারটি ভবনের নির্মাণকাজ তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর শেষ হওয়ার কথা চলতি মাসে। অথচ কাজ শেষ হয়েছে ৭০ থেকে ৯৫ শতাংশ। বর্তমানে প্রকল্পগুলোর মেয়াদ আরও এক দফা বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে।
প্রকল্পগুলোর নির্মাণ শর্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ না হলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে অসম্পাদিত কাজের মূল্যমানের ওপর দশমিক শূন্য ৫ থেকে দশমিক ১০ শতাংশ জরিমানা গুনতে হবে। এই হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৩ কোটি টাকার জরিমানা আদায় না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিল ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের প্রতিবেদনেও।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রথমে ৩৬৩ কোটি টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। এই প্রকল্পের আওতায় অপরাজিতা (সাবেক প্রস্তাবিত শেখ হাসিনা) হল, বিজয় ৭১ (সাবেক প্রস্তাবিত এ এইচ এম কামারুজ্জামান) হল, ১০ তলা শিক্ষক কোয়ার্টার, ২০ তলা একাডেমিক ভবন, ড্রেন নির্মাণ, শেখ রাসেল মডেল স্কুলসহ বেশ কয়েকটি স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়। পরে একনেক ২০১৯ সালে সংশোধিত আকারে ৫১০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়। নির্মাণাধীন এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় তিন দফায় সময় বাড়িয়ে ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।
আলোচিত মজিদ সন্স
প্রকল্পের আওতায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ তলা বিজয় ৭১ হলের নির্মাণকাজ পায় রূপপুরে ‘বালিশকাণ্ডে’ তুমুল আলোচিত মজিদ সন্স অ্যান্ড কোম্পানি। তিন দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর হলটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে প্রায় ৯৫ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের কাজটি সম্পন্ন করে হস্তান্তর করার কথা ছিল।
তবে হলটি আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের আগেই বিভিন্ন দেয়াল, পিলারের ওপরের পলেস্তারাতে ফাটল দেখা গেছে। এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। উদ্বোধনের আগেই ঝুঁকিতে থাকা শের-ই বাংলা ফজলুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থীদের একটি ব্লকে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়।
হল সংসদের কার্যনির্বাহী সদস্য সাহিব বিল্লাহ বলেন, নিরাপত্তার জন্য আমাদের নতুন হলে আনা হয়েছে। অথচ উদ্বোধনের আগেই এই ভবনে ফাটল দেখা দিয়েছে। এর আগে এই হলের মিলনায়তন ধসে পড়েছিল। এসব কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
রাবি শাখা ছাত্রপক্ষের আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা বলেন, আমরা নিরাপত্তার জন্য এসেছিলাম। কিন্তু এখানে আরও বেশি অনিরাপদ মনে হচ্ছে।
হল শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মারুফ হাসান জেমস বলেন, নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার হয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করা দরকার। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ভবনটির বিশেষজ্ঞ তদন্তের দাবি জানাই।
এ বিষয়ে মজিদ সন্সের নির্বাহী পরিচালক জারগিছুর রহমান বলেন, ভবনে ফাটলের বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট আসার আগে এ বিষয়ে আমাদের কথা বলা ঠিক হবে না। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এক-তৃতীয়াংশ কাজ বাকি তিন ভবনে
মজিদ সন্স ২০ তলাবিশিষ্ট একাডেমিক ভবনের নির্মাণকাজও পায়। বর্তমানে ওই ভবনের ১৭ তলার ছাদের ঢালাই শেষ হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন তলার দেয়াল নির্মাণসহ একাধিক কাজ চলমান। নির্মাণাধীন অপরাজিতা হলের অষ্টম তলার ছাদের ঢালাই শেষ হয়েছে। এর বাইরে কয়েকটি তলার দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। প্রকল্পটির ম্যানেজার জাকির হোসেন সমকালকে বলেন, আমাদের এখানে ৭০ শতাংশের মতো কাজ হয়েছে। আমাদের আরও এক দফা মেয়াদ বাড়াতে হবে। অন্যদিকে ১০ তলা শিক্ষক কোয়ার্টারের সপ্তম তলার ছাদ ঢালাই শেষ হয়েছে।
যা বলছেন কর্তৃপক্ষ ও ছাত্রনেতারা
এ বিষয়ে রাবি শাখা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের আহ্বায়ক ফুয়াদ রাতুল বলেন, আমরা অতীতে দেখেছি উন্নয়নের নামে বিপুল দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। ঠিকাদারদের জবাবদিহির অন্যতম মাধ্যম জরিমানা আদায়। সেটি না করেই বিল দিয়ে সাবেক ‘নকীব প্রশাসন’ আগের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল কাফি বলেন, মেয়াদ বাড়ানো হয়, কিন্তু প্রকল্প শেষ হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, এই বিষয়গুলো খুব হতাশাজনক। বারবার মেয়াদ পেছালে মূলত টেন্ডার সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষা হয় আর শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়। যাদের কাজ দেওয়া হয়েছে, তাদের কড়া জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার প্রধান কর্মকর্তা ও প্রকল্প পরিচালক ওবায়দুর রহমান বলেন, আমাদের প্রকল্পগুলোর বেশির ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে যে কাজ রয়েছে, তা চলমান মেয়াদে শেষ করা সম্ভব হবে না। ফলে আমাদের মেয়াদ বাড়াতে হবে। আমরা চেষ্টা করব বাস্তবসম্মতভাবে মেয়াদ বৃদ্ধি করে নির্দিষ্ট সময়ে কাজ শেষ করতে।
বিজয়-৭১ হলে ফাটলের বিষয়ে তিনি বলেন, ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি রয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। বিম ও দেয়ালের সংযোগস্থল কিংবা ভিন্ন অংশে করা প্লাস্টারের কারণে এ ধরনের ফাটল দেখা দিতে পারে।
প্রকল্পের বিল পরিশোধে অডিট আপত্তির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী আবুল কালাম আজাদ বলেন, প্রকল্পের মেয়াদকালে মালপত্রের দাম বাড়লে এবং যৌক্তিক কারণে মেয়াদ বাড়ানো হলে জরিমানার বিষয়টি বিবেচনার সুযোগ থাকে। এখানে নিয়মবহির্ভূত কোনো কিছু ঘটেনি।
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল আলীম বলেন, এই প্রকল্পগুলো গ্রহণ করার পর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, করোনা ভাইরাসসহ নানা বাধা এসেছে। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রকল্পের চলমান মেয়াদ শেষ হবে। আমরা চেষ্টা করব আগামী মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পগুলো শেষ করতে।
- বিষয় :
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
- রাবি
- আবাসিক হল
