যমুনার ভাঙনে নির্ঘুম রাত চরাঞ্চলের মানুষের
সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার চর সেলিমাবাদে যমুনার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সমকাল
আমিনুল ইসলাম খান রানা, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
যমুনা নদীর পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সিরাজগঞ্জের সদর, কাজিপুর ও চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত ১০ থেকে ১৫ দিনের ভাঙনে শতাধিক বাড়ি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গাছপালা ও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। নদীর আগ্রাসন অব্যাহত থাকায় প্রতিদিনই নতুন নতুন এলাকা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ভাঙন আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদী তীরের হাজারো মানুষ।
স্থানীয় সূত্র জানায়, কাজিপুর উপজেলার চরগিরিশ ইউনিয়নে ভাঙনের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি। একসময় কয়েকশ পরিবার বসবাস করলেও কয়েক বছরের ধারাবাহিক ভাঙনে জনপদের বড় একটি অংশ নদীতে বিলীন হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, ভাঙন যেভাবে অব্যাহত রয়েছে, তাতে আরও অসংখ্য পরিবারের বসতভিটা যে কোনো সময় নদীতে হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ৩০-৪০টি বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, বহু বছরের সঞ্চয়ে গড়ে তোলা ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজনের বাড়ি কিংবা অন্যের জমিতে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছে। শুধু বসতভিটাই নয়, পূর্বপুরুষের কবরস্থান, মসজিদ এবং সামাজিক বিভিন্ন স্থাপনাও ভাঙনে হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর যমুনার ভাঙন চললেও কার্যকর ও স্থায়ী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা আগে থেকে চিহ্নিত থাকলেও সময়মতো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ভাঙন শুরু হলে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে তা ভাঙন ঠেকাতে পারছে না। তাদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও স্থায়ী তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ ছাড়া এ দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
একই চিত্র দেখা গেছে চৌহালী উপজেলার বাগুটিয়া ইউনিয়নের চরসলিমাবাদ, ভূতের মোড়, বিনানুই ও ভুসুরিয়া চরাঞ্চলেও। প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলমান ভাঙনে গত দুই সপ্তাহে বসতবাড়ি, মসজিদ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, দোকানপাটসহ অন্তত ৪০ থেকে ৫০টি স্থাপনা নদীতে বিলীন হয়েছে। পাশাপাশি শত শত বিঘা আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ তীররক্ষা বাঁধের প্রায় ৩০ মিটার অংশ গত সপ্তাহে যমুনায় বিলীন হয়েছে। সেখানে বাঁধের ভাঙন ঠেকাতে জিও ব্যাগে বালি ভরে ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। তবে এতে শঙ্কা কাটছে না স্থানীয়দের।
যমুনার পানি বাড়তে থাকায় সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি ও শাহজাদপুর উপজেলার নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতেও ভাঙন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিচু এলাকার ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও নৌকা ছাড়া চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। পানি বাড়লে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, যমুনায় পানি বাড়ায় সদর, শাহজাদপুর, চৌহালী উপজেলার কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। যেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলে তীর সংরক্ষণের কাজ চলছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছি। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের বিষয়টিও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
- বিষয় :
- যমুনার চর
