ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

অশ্রু লুকিয়ে ছেলের চোখ মুছছেন মা

অশ্রু লুকিয়ে ছেলের চোখ মুছছেন মা
×

সাভারের রাজাসন মহল্লার টিনের ছোট্ট ঘরে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতর রিপন দাস। মা আশন্তি অবিরাম কাঁদছিলেন আর ছেলের চোখ-মুখ মুছে দিচ্ছিলেন। গতকাল রোববার তোলা। ছবি: সমকাল

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১১:৩৪

ঢাকার সাভারের রাজাসন মহল্লার ঈদগাও মাঠের অদূরে শাজাহানের বাগানবাড়ী লাগোয়া একটি টিনশেড ঘর। সেখানে মা-বাবার সঙ্গে থাকে নির্যাতনের শিকার কিশোর রিপন দাস। গতকাল রোববার দুপুরে তাদের বাসায় গিয়ে দেখা যায়, রিপন বিছানায় শুয়ে আছে। শুকিয়ে কঙ্কালসার হয়ে গেছে তার শরীর। পাশে বসে আছেন তার মা আশন্তি। ছেলের চোখ-মুখ মুছে দিচ্ছেন। তাঁর দুই চোখ থেকেও থেকে অশ্রু ঝরছে। বার বার তা মুছে যেন কান্না লুকোনোর চেষ্টা করছেন।

ঘরের ভেতর ছিলেন রিপনের বাবা ও এক বোন। কিন্তু সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তারা কোনো কথা বলতে চাইলেন না। এর মধ্যেই ঘরে প্রবেশ করেন মাঝবয়সী এক ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পর ঢোকেন এক যুবক। জানান, মাহবুব হোসেন সামির তাঁকে পাঠিয়েছেন। সামির সদ্য বহিষ্কৃত ছাত্রদল নেতা। কিশোর রিপনকে নির্যাতনের ঘটনায় করা মামলার প্রধান আসামি। এরপর ওই যুবককে উদ্দেশ করে মাঝবয়সী লোকটি বলেন, ‘তুমি এখান থেকে চলে যাও, আমি আছি।’

মামলা করার পর থেকে এভাবেই সামিরের লোকজন কিশোর রিপনের পরিবারটিকে চোখে চোখে রাখছেন। মামলা তুলে নিতে চাপ দিচ্ছেন। ইতোমধ্যে সামিরের মা ও এক মামা এসে রিপনের চিকিৎসার জন্য ১০ হাজার টাকা দিয়েছেন। মামলা তুলে নিতে বলে গেছেন।

নির্যাতনের ঘটনায় গত বৃহস্পতিবার সাভার থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক (বর্তমানে বহিষ্কৃত) মাহবুব হোসেন সামিরকে প্রধান আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতানামা পাঁচ-ছয়জনকে আসামি করে সাভার মডেল থানায় মামলা করেন রিপনের বোনজামাই স্বপন সূত্রধর। চার দিন পার হলেও কোনো আসামি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্রেপ্তার হননি।

মামলার বাদী স্বপন সূত্রধর সমকালকে বলেছেন, এজাহারভুক্ত আসামিরা এলাকায় প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। মামলা তুলে নিতে নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছেন। রিপনের পরিবারটি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

এদিকে প্রধান আসামি সামির সংবাদ সম্মেলন করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। বলেছেন, তিনি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। তাঁকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

রিপনের মা আশন্তি ঋষি মনি দাস একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন। বাবা জীবন মনি দাস ওই এলাকায় চর্মকারের কাজ করেন। দুই বোন দুই ভাইয়ের মধ্যে রিপন সবার ছোট। দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। 

গতকাল দুপুরে এক পর্যায়ে ‘সামিরের পাঠানো’ সেই মাঝবয়সী লোকটি চলে গেলে রিপন দাস সমকালকে জানান, গত ২ জুন বিকেল ৪টার দিকে রাজাসন পালোয়ানপাড়া এলাকায় রাজধানী বেকারির সামনে থেকে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় একটি অফিসে। সেখানে দেয়ালের সঙ্গে তার মাথা আছড়ে মারা হয়। লাঠি দিয়ে বেধড়ক পেটানো হয়। তার দুই চোখেও আঘাত করা হয়। নির্যাতনের সময় অভিযুক্তদের একজন তার হাতে একটি চাকু ধরিয়ে দিয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেন।

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে রিপন আরও জানায়, তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়েছে। অস্ত্রোপচার করতে হবে। এখন শরীর খুব দুর্বল। তা ছাড়া অস্ত্রোপচার করানোর টাকাও নেই পরিবারটির হাতে। সে আরও জানায়, তার চোখের কর্ণিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চোখের উন্নত চিকিৎসা করাতে হবে।

জানতে চাইলে সাভার মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত ) নূর মোহাম্মদ দাবি করেন, আসামি গ্রেপ্তারে পুলিশের কয়েকটি টিম অভিযান অব্যাহত রেখেছে। শিগগির এই মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হবে।

আরও পড়ুন

×