শেরপুর
৪২ কেজিতে মণ না দিলে ধান কেনা বন্ধ
দেবাশীষ ভট্টাচার্য, শেরপুর
প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১১:৫৯
শেরপুরের গ্রামগঞ্জে ধানের বাজার আড়তদারদের নিয়ন্ত্রণে। তাদের কাছে একপ্রকার জিম্মি কৃষকরা। প্রতি মণে দুই কেজি বেশি ধান দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। আড়তদারদের সঙ্গে পেরে উঠছেন না প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। কিছু বললে বা আইনি ব্যবস্থা নিলে ধান কেনা বন্ধ করে দেওয়া হয়। আন্দোলন করেও কোনো সুরাহা মেলেনি।
শুধু ধান নয়, বাজারের ইজারাদারও কৃষকের ওপর চেপে বসেছেন। কৃষকদের কাছ থেকে মণপ্রতি ৫-১০ টাকা খাজনা আদায় করছেন। বাজারে ধানের ন্যায্য দাম নেই। তার ওপর মণপ্রতি অতিরিক্ত দুই কেজি ধান ও ইজারাদারদের টাকা দিতে গিয়ে হিমশিম অবস্থা কৃষকের।
এদিকে বস্তা সরবরাহ না থাকায় ধান কেনা বন্ধ রেখেছে খাদ্য বিভাগ। জেলায় নিবন্ধিত সাড়ে তিন হাজার কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাঁচ উপজেলার মাত্র ৭৭০ কৃষক খাদ্য গুদামে ধান দিতে পেরেছেন। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কেনার কথা থাকলেও বস্তা কেনার সময় দুই মাস বৃদ্ধি করায় গুদামে ধান নেওয়া অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। যার প্রভাব পড়ছে বাজারেও। এতে ধানের দাম বাড়ার বদলে দিন দিন কমছে।
শ্রীবরদী উপজেলার ভায়াডাঙ্গা, ঝগড়ারচর, ঝিনাইগাতী সদর বাজার, নালিতাবাড়ীর আড়াইআনী বাজার, সদরের গাজীর খামারসহ কয়েকটি বাজারে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাজারে প্রতি মণ মোটা জাতের শুকনো ধানের দাম এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ১২০ টাকা। সেই হিসেবে এক কেজি ধানের দাম ২৮ টাকা। অথচ এসব বাজারে কৃষকের কাছ থেকে মণপ্রতি ২ কেজি ধান বেশি নিচ্ছেন আড়তদাররা। দুই কেজি ধানের দাম ৫৬ টাকা ও ইজারা কমপক্ষে ৫ টাকা যোগ করলে এক মণ ধান বিক্রি করে কৃষক পাচ্ছেন ১০৫৯ টাকা। এ ছাড়া পরিবহন খরচ তো আছেই।
অথচ ২০১৮ সালের আদর্শ ও ওজন পরিমাপ আইনে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে– ওজনে কেউ বেশি নিলে এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা এক বছরের জেল অথবা জেল-জরিমানা উভয় দণ্ড দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু আড়তদার সিন্ডিকেটের শক্তি এতই বেশি যে শাস্তি দিতে গেলে বাজারে ধান কেনা বন্ধ হয়ে যায়। তাই প্রশাসনও নীরব।
জানা গেছে, অতিরিক্ত ধান নেওয়ার এই পদ্ধতি স্থানীয়ভাবে ‘ঢলতা’ নামে পরিচিত। ভেজা, ময়লা-আবর্জনা, ভুসি, চিটা এমন নানা অজুহাতে ঢলতা নাম দিয়ে মণপ্রতি দুই কেজি ধান কৃষকের কাছ থেকে বেশি নেন আড়তদাররা। বেশি দিতে না চাইলে বাজারে কোনো আড়তদার ধান কেনেন না।
শ্রীবরদী উপজেলার রানীশিমূল ইউনিয়নের ভায়াডাঙ্গা বাজার সীমান্ত অঞ্চলের সবচেয়ে বড় ধানের হাট। এখানে মৌসুম বুধ, শনি ও সোমবার প্রতি হাটে ৮-১০ হাজার মণ ধান বিক্রি হয়। সম্প্রতি ২ কেজি করে ধান বেশি নেওয়া এবং ১০ টাকা ইজারার প্রতিবাদ করেন কৃষকরা। বিষয়টি প্রশাসনের নজরে আসে। বাজারে অভিযান চালান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনীষা আহমেদ। অতিরিক্ত ধান নেওয়ায় ২০১৮ সালের আদর্শ ও ওজন পরিমাপ আইনে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেন তিনি। এই ঘটনার প্রতিবাদে ধান কেনা বন্ধ করে দেন বিক্ষুব্ধ আড়তদাররা।
২০ জুন হাটে আড়তদাররা ধান কেনা বন্ধ করে দিলে ঘটনাস্থলে যান শেরপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেল ও জেলা প্রশাসক ফরিদা ইয়াসমিন। তারা মণপ্রতি ৪০ কেজির স্থলে সাড়ে ৪১ কেজি করে ধান এবং ইজারা ১০ টাকার বদলে ৫ টাকা করে দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন। তার পরও ২৪ জুন হাটে পরিচ্ছন্নতার নামে মণপ্রতি অতিরিক্ত দুই টাকা করে কৃষকের কাছ থেকে নেওয়া হয় বলে জানান এক কৃষক।
রানীশিমূল গ্রামের কৃষক আশরাফ আলম, সাইফ মিয়া ও গারামারা গ্রামের শহিদুল্লাহ অভিযোগ করেন, মহাজনরা সিন্ডিকেট করেছেন। তাদের কাছে এমপি, ডিসি, ইউএনওর কোনো মূল্য নেই। কৃষকরা অসহায়। অনিয়মই বর্তমানে নিয়মে পরিণত হয়েছে। ধান বিক্রি করতে এসে কৃষকদের ঠকতে হচ্ছে।
ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের পানবর গ্রামের কৃষক আনিসুল ইসলাম বলেন, মণপ্রতি দেড় থেকে দুই কেজি বেশি ধান নিচ্ছেন আড়তদাররা। এটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। জানকী খিলার বৃদ্ধ কৃষক সামিউলের ভাষ্য, কৃষক সবদিকেই মরা। ধানের দাম কম, ২ কেজি করে বেশি নেয়, আবার কিছু কিনতে গেলেও ১০ টাকা ইজারা দিতে হয়।
ভায়াডাঙ্গা বাজারের আড়তদার সিদ্দিকুর রহমানের ভাষ্য, ৫-৬ বছর আগে থেকেই ৪২ কেজি ও ১০ টাকা ইজারা নেওয়া হতো। বর্তমানে এমপির নির্দেশে সাড়ে ৪১ কেজি ধান এবং ইজারা ৫ টাকা এবং মালিদের জন্য এক থেকে দুই টাকা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, তারা ধান কিনে মিল মালিকদের কাছে বিক্রি করেন। মিল মালিকরা ভেজা, ময়লা, ভুসি, চিটা ধানের জন্য ২ কেজি করে বেশি নেন। তারা যদি ৪০ কেজি নিতেন, তাহলে সমস্যা হতো না। ৪০ কেজি নিলে তাদের লোকসান হবে।
ঝিনাইগাতী বাজারের প্রবীণ আড়তদার মো. ছানাউল্লাহ বলেন, বর্তমানে তারা মণপ্রতি সাড়ে ৪১ কেজি ধান নিচ্ছেন। খাদ্য গুদামেও চিটা ও ভেজা ধান নেওয়া হয় না। সেখানে ওজনে আরও বেশি নেওয়া হয়। তিনি বলেন, তারা মিল মালিকদের কাছ থেকে ২০ টাকা কমিশন পান এবং চটের বস্তাসহ এক বস্তায় ৭৭ কেজি ৫০০ গ্রাম ধান দুই মণ হিসেবে বিক্রি করেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সাখাওয়াত হোসেন জানান, এ বছর জেলায় ধান হয়েছে ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৯৮৬ টন। জেলায় কৃষক পরিবার দুই লাখের ওপর।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নাজমুল হক ভূঁইয়ার ভাষ্য, জেলায় ২১ হাজার ২২৯ টন ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এখন পর্যন্ত মাত্র ২২ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। ৩১ আগস্ট পর্যন্ত কেনা হবে। ৫০ কেজির বস্তার সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব বস্তা খাদ্য অধিদপ্তর থেকে সংগ্রহ করা হয়। অপ্রত্যাশিতভাবে বস্তা সংগ্রহ দুই মাস পিছিয়ে গেছে। বস্তা পেলে সংগ্রহ কার্যক্রমে গতি বাড়বে।
শ্রীবরদীর ইউএনও মনীষা আহমেদ বলেন, অন্যান্য জায়গায় ৪২ কেজি নিচ্ছে। ধান বেশি নেওয়ার জন্য জরিমানা করেছিলেন। তাতে কৃষকরা সন্তুষ্ট নন, কিন্তু এক দিনে সব সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। আপাতত সাড়ে ৪১ কেজি এবং ইজারা ৫ টাকা করা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতার জন্য কোনো টাকা নিতে পারবে না।
সংসদ সদস্য মাহমুদুল হক রুবেলের ভাষ্য, ১০ বছর ধরে শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী নালিতাবাড়ীসহ সব বাজারে অনিয়ম চলছে। এক দিনে অনিয়ম দূর হবে না। জেলার সব বাজার ঠিক করতে হবে। এজন্য মিল মালিক আড়তদার, কৃষক সবাইকে নিয়ে বসতে হবে। আগে ইজারা ১০ টাকা নেওয়া হতো। এখন ৫ টাকা জমা নেবে। পরের বছর বাজার ইজারা হলে ৩ টাকায় আনা হবে। কৃষক না বাঁচলে তো ব্যবসা থাকবে না এবং অর্থনীতি থাকবে না।
- বিষয় :
- শেরপুর
