ঢাকা সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬

বরগুনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি

এক বছর পরেও হটস্পটে সেই আগের চিত্র

এক বছর পরেও হটস্পটে সেই আগের চিত্র
×

বরগুনা শহরের শহীদ স্মৃতি সড়ক সংলগ্ন পরিত্যক্ত ডোবায় দূষিত পানি ও আবর্জনার স্তূপ। ছবি: সমকাল

আবু জাফর সালেহ্, বরগুনা

প্রকাশ: ২৯ জুন ২০২৬ | ১১:৪১ | আপডেট: ২৯ জুন ২০২৬ | ১১:৪১

বরগুনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত শহীদ স্মৃতি সড়ক। এই সড়কের পাশেই গণপূর্ত বিভাগের একটি পরিত্যক্ত ডোবা। এর মধ্যে দূষিত পানিসহ আবর্জনার স্তূপ। চারপাশে বসবাস করছে অন্তত ২৫টি পরিবার। সঙ্গে রয়েছে সরকারি-বেসরকারি একাধিক কার্যালয়। নাকেমুখে কাপড় চেপেও সেখানে দুই মিনিট অবস্থান করা সম্ভব নয়। এই নোংরা জায়গা থেকে ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু রোগের বাহক এডিস মশা। এর ফলে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা।

২০২৫ সালে সারাদেশের মধ্যে বরগুনা ডেঙ্গু আক্রান্তের হটস্পটে পরিণত হয়েছিল। দেশের মোট আক্রান্তের প্রায় ১০ শতাংশ ছিল এই জেলায়। গত বছর শহর পরিদর্শনের পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং করণীয় বিষয়ে নানা পরামর্শ দেয় সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। 

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এবার এখনও গত বছরের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে আইইডিসিআর যেসব পরামর্শ দিয়েছিল, তার অধিকাংশ মানা হয়নি। 

হয় না পরিচ্ছন্নতার কাজ

গত ২৫ জুন গণপূর্ত বিভাগের পরিত্যক্ত ডোবা এলাকায় কথা হয় টিনশেড ঘর তুলে বসবাস করা নিরালা বেগমের সঙ্গে। গত বছর তাদের পরিবারের আট সদস্যের মধ্যে সাতজনই ডেঙ্গু আক্রান্ত হন। নিরালা জানান, গত বছরের জুন মাসে যখন ডেঙ্গুর মহামারি দেখা দেয়, তখন পৌরসভা থেকে কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী এসে দেখে যান। এরপর এক বছরে পৌরসভার কোনো পরিচ্ছন্নতাকর্মী সেখানে আসেননি। 

নিজেরা কেন আবর্জনা পরিষ্কার করছেন না– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকারি ডোবা তো পৌরসভা থেকে পরিষ্কার করার কথা। কিন্তু তাদের একাধিকবার বলার পরও পরিষ্কার করতে আসছে না।

আইইডিসিআর যে পরামর্শ দিয়েছিল

আইইডিসিআর পরামর্শ দিয়েছিল, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে ‘ব্রেটো ইনডেক্স’ (কীটতত্ত্বীয় পরিমাপের একটি একক) যুক্ত এলাকাগুলোতে অবিলম্বে মশার লার্ভার উৎস ধ্বংস করার কর্মসূচি পরিচালনা করতে হবে, ফগিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে।

এ ছাড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও ঝুঁকি বিষয়ক যোগাযোগ জোরদার করা, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা, পানি সংরক্ষণের সঠিক পদ্ধতি এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেয় আইইডিসিআরের প্রতিনিধি দল। কিন্তু এসব নির্দেশনা তেমন মানতে দেখা যায় না। গত ২৪ জুন শহরের সদর সড়কের একটি বাসায় গিয়ে দেখা যায়, চারটি বড় ড্রামে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এসব পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্ম নিতে পারে কিনা– জানতে চাইলে বাসার মালিক রুমা আক্তার বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি পানি ঢেকে রাখার। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ছাড়া আমাদের উপায় নেই। কারণ পৌরসভা থেকে যে পানি সরবরাহ করা হয়, তা পুরোপুরি বিশুদ্ধ না।’ 

জুলাই-আগস্ট ঘিরে আতঙ্ক

বরগুনা সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫ সালের এপ্রিলের শুরুর দিকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। ৩০ জুনের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়ায় দুই হাজার ৯৩২ এবং ৩১ জুলাইয়ে চার হাজার ৮৬০-এ। শুধু জুলাই মাসে আক্রান্ত হয় এক হাজার ৯২৮ জন। তবে গত বছরের তুলনায় এ বছর বরগুনায় এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটা কম হলেও হঠাৎ করে বাড়তে শুরু করেছে।

গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২১৬। চিকিৎসকরা বলছেন, জুলাই ও আগস্ট মাস ডেঙ্গুর জন্য খুবই ভয়াবহ সময়। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা যা বলছেন

পরিচ্ছন্নতা অভিযান নিয়মিত চলছে দাবি করে বরগুনা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম রিপন বলেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। 

বরগুনার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ্ দাবি করেন, পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যকর ভূমিকার কারণে এখনও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

জেলা প্রশাসক তাছলিমা আক্তার বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মাইকিং, সেমিনারসহ বেশকিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মানুষ আগের চেয়ে একটু সচেতন হয়েছে। এসব কারণে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর প্রকোপ কম।

আরও পড়ুন

×