ঢাকা সোমবার, ২০ জুলাই ২০২৬

ইয়াবায় গড়া তাদের পাকা ঘর খাসা

ইয়াবায় গড়া তাদের পাকা ঘর খাসা
×

টেকনাফের আলীখালীতে নুরুল কবিরের বাড়ি। একসময় তিনি ছিলেন ট্রাকচালকের সহকারী। এখন দৃষ্টিনন্দন বিশাল বাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক। সম্প্রতি তোলা- সমকাল

অমিতোষ পাল, ঢাকা, আব্দুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২৬ | ০৭:৫১ | আপডেট: ৩০ জুন ২০২৬ | ১০:০৪

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার অজপাড়াগাঁয়েও চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন বাড়ি। রাজধানীতেও এ রকম আধুনিক বাড়ি খুব বেশি দেখা যায় না। গ্রামে এমন বাড়ির ছড়াছড়ি দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে– এসবের মালিক কারা?

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ বাড়ির মালিকের নামে ইয়াবা কারবারের অভিযোগ আছে। মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা এ এলাকায় মাঝেমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে ইয়াবা। 

একদিকে বঙ্গোপসাগর, আরেক দিকে মিয়ানমার। আর আছে পাহাড়-টিলা। এরই মাঝ দিয়ে চলে গেছে নাফ নদ। মাছ ধরা, সুপারি বাগান, অল্পস্বল্প কৃষিকাজ ও সমুদ্রের পানি আটকে লবণ চাষই ছিল একসময় এলাকার মানুষের প্রধান কাজ। একুশ শতকের প্রথম দশকে শুরু হয় ইয়াবার কারবার। এর পর থেকে টেকনাফের কিছু লোক ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করে। ট্রাকচালকের সহকারী থেকে অনেকে রাতারাতি হয়ে যান বিত্তবৈভবের মালিক। 

টেকনাফ-কক্সবাজার মহাসড়কে লেদা এলাকার আরাকান রোড পয়েন্টে দৃষ্টিনন্দন একটি বাড়ি কারও নজর এড়ায় না। প্রায় তিন বিঘা জমির ওপর চারতলা বাড়ি। চারপাশে উঁচু প্রাচীর। জমির এক-তৃতীয়াংশে মূল বাড়িটি। চারপাশে ফুল ও ফলের গাছ। আছে গাড়ি পার্কিংয়ের ছাউনি। অনেক ডাকাডাকি করেও সেখানে কাউকে পাওয়া গেল না।

স্থানীয়রা জানান, বাড়ির মালিকের নাম নুরুল হুদা। একসময় ছিলেন লবণচাষি। পরে ইয়াবা ব্যবসার অভিযোগে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। জেলে যান। তার আরেক ভাই নূর মোহাম্মদও ইয়াবা কারবারি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিগত সরকারের আমলে নূর মোহাম্মদ কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান। তাদের আরেক ভাই শামসুল আলমকে পাহাড়ে ডেকে নিয়ে কে বা কারা হত্যা করে। আর নুরুল হুদা সর্বশেষ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হ্নীলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি পলাতক।

আরেকটি বাড়ি দেখা যায়, একই মহাসড়কের আলীখালীতে। প্রধান সড়ক থেকে বাড়িতে ঢোকা পর্যন্ত একটি খালের ওপর নিজস্ব অর্থে কালভার্ট বানিয়ে বাড়িটি তৈরি করা হয়েছে। ভেতরে প্রবেশের আগে রয়েছে লোহার বড় গেট। সেটা পেরোনোর পর কারুকার্যখচিত অভ্যর্থনা ফটক। দুপাশে শ্বেতপাথরের বসার বেঞ্চ। এরপর বাড়ির সীমানা ফটক। দূর থেকে দেখা যায় তিনতলা বাড়ির ভেতরে গাছপালার সমাহার। ফটকে করাঘাত করেও কারও সাড়া পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা জানান, বাড়িটি নুরুল কবিরের। একসময় ছিলেন ট্রাকচালকের সহকারী। এখন বিলাসবহুল বাড়ি, ইটের ভাটা, ট্রাক্টর, লবণ চাষ, কৃষিজমি প্রভৃতির মালিক। এসবের পেছনে ইয়াবা ব্যবসা রয়েছে বলে এলাকাবাসীর ভাষ্য।

বাড়ির কিছু দূরে একটি মসজিদে জোহরের নামাজ পড়ে বের হন নুরুল কবির। তিনি দাবি করেন, ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে কখনও জড়িত ছিলেন না। তাঁর বাবার অনেক জমিজমা ছিল। সেখান থেকে নিজে ব্যবসা করে এসবের মালিক হয়েছেন। ট্রাকচালকের সহকারী থাকার তথ্যও সঠিক নয়।

কিছু দূর পরই শিকদারপাড়ায় দেখা মেলে আরও দুটি বাড়ির। একটি পাঁচতলা, আরেকটি চারতলা। দুটির মালিকই রশিদ আহম্মদ। একটিতে পরিবার নিয়ে থাকেন; আরেকটি ভাড়া দেওয়া। দুটিতেই আধুনিকতার ছোঁয়া আছে। এ ছাড়া আছে চিংড়ি ঘের ও ব্যবসা। ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকার দায়ে রশিদ দম্পতি এক বছর জেলও খেটেছেন। ইয়াবা কারবারে জড়িত থাকার অভিযোগে রশিদ আহম্মদের ভাতিজা আজিজুল বশির শাহিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে নিহত হন। আরেক ভাই সৈয়দ আহমদ জেলে যান। কিন্তু বাড়িতে রশিদ আহম্মদকে পাওয়া যায়নি। পথে পাওয়া যায় তাঁর ছেলে জিয়াউর রশিদ ইলহামের।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করা ইলহাম বলেন, তাদের পরিবারের কেউ ইয়াবা কারবারে জড়িত ছিল না। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকায় পুলিশ ভয় দেখাত। একদিন তাদের পুলিশ সুপারের (এসপি) কার্যালয়ে হাজিরা দেওয়ার পরামর্শ দেয়। সেখানে গেলে আটক করে রাখে। ২২ দিন পর তার বাবা-মাকে তিন লাখ ইয়াবা দিয়ে আত্মসমর্পণের নাটক সাজায়। জেলে পাঠায়। ছাড়া পাওয়ার পর দুদক মামলা দেয় জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ থাকার অভিযোগে। এখন সেসব মামলা চলছে।

টেকনাফ শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে সাবরাং ইউনিয়নের মণ্ডলপাড়ায় প্রধান সড়কের পাশে চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন আরেকটি বাড়ি। স্থানীয়দের ভাষায় এটি ‘রাজপ্রাসাদ’। বাড়িটির মালিক মোহাম্মদ জোবাইর। স্ত্রী ফইজা আক্তারসহ পরিবার নিয়ে সেখানে বসবাস করেন তিনি।

স্থানীয়দের দাবি, একসময় ছোট্ট ভাঙা চায়ের দোকান চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন জোবাইর। এক দশকের ব্যবধানে তার জীবনযাত্রায় আসে নাটকীয় পরিবর্তন। এখন তার রয়েছে আলিশান বাড়ি, ব্যক্তিগত গাড়ি, মাছ ধরার ট্রলার, জমি-প্লট। 

সরেজমিন দেখা যায়, বাড়ির গেটের দুই পাশে স্থাপন করা সিসি ক্যামেরা। সম্প্রতি মাদক মজুতের অভিযোগে টেকনাফ-২ বিজিবি প্রায় আট ঘণ্টা অভিযান চালায় ওই বাড়িতে। অভিযানে নগদ ১০ লাখ টাকা, ১৯ হাজার ইয়াবা, ১৩০ গ্রাম ইয়াবা তৈরির পাউডার ও ওয়াকিটকি উদ্ধার করা হয়। এ সময় জোবাইরের স্ত্রী ফইজা আক্তারকে আটক করা হলেও জোবাইর পালিয়ে যান।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, ‘হঠাৎ করে তাদের চলাফেরা বদলে যায়। কয়েক বছর উধাও থাকার পর ফিরে এসে রাজার মতো জীবনযাপন শুরু করেন। এলাকায় অনেকে অল্প সময়ে কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। এর পেছনে ইয়াবাই মূল উৎস।’

টেকনাফ সদর ইউনিয়নের লেঙ্গুরবিল এলাকার বাসিন্দা জাফর আহমেদের বাড়িটিও যে কেউ দেখলে বিস্মিত হবে। তিনি সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। জাফর তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী। তিনি টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সহসভাপতিও। জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে পলাতক। 

চার ভাইয়ের পারিবারিক চক্র
একই চিত্র সুদ্দিন, শাহাব উদ্দিন, ফয়েজ উদ্দিন ও হাফেজ নেজাম উদ্দিন। কয়েক বছর আগেও কেউ ছিলেন বেকার, কেউ জেলে। এখন তাদের সারিবদ্ধ বহুতল বাড়ি, পাঁচটি মাছ ধরার ট্রলার, গাড়ি ও বিপুল জমিজমা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফয়েজ উদ্দিন একাধিক মাদক মামলার আসামি। মামলায় ১৫ বছরের সাজাও হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাছ ধরার ট্রলারের ব্যবসার আড়ালে ইয়াবা পাচার করতেন তারা। পরে চার ভাই মিলে একটি পারিবারিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।

‘ইয়াবা গ্রাম’ 
টেকনাফ সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া ও মৌলভীপাড়া এলাকা স্থানীয়দের কাছে ‘ইয়াবা গ্রাম’ হিসেবে পরিচিত। নাজিরপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী, যার একসময় স্থায়ী কোনো পেশা ছিল না। গত এক দশকে তিনি বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন। ইয়াবা কারবারির সরকারি তালিকায় তাঁর নাম আছে। 

একই চিত্র মৌলভীপাড়ার মোহাম্মদ শরীফের। জেলে পরিবারের সদস্য শরীফ একসময় দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেছেন। এখন তিনি আলিশান বাড়ির মালিক। সেন্টমার্টিনে কটেজ, মেরিন ড্রাইভে জমিসহ বিপুল সম্পদের মালিক।

পুলিশ ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, ইয়াবার টাকায় মৌলভীপাড়া, নাজিরপাড়া ছাড়াও লেদা, নেঙ্গরবিল, চৌধুরীপাড়া, দক্ষিণ জালিয়াপাড়া, ডেইলপাড়া, অলিয়াবাদ, শিলবনিয়াপাড়াসহ টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায় সারি সারি বিলাসবহুল বাড়ি গড়ে উঠেছে। তালিকাভুক্ত ১২৩ ইয়াবা কারবারির মধ্যে থাকা মুহাম্মদ সালমান, মোহাম্মদ আনোয়ার, নুরুল আমিন, অলি আহমেদসহ আরও অনেকের রয়েছে এ রকম বাড়ি-সম্পদ। অভিযান এড়াতে অনেকে বাড়িতে তালা ঝুলিয়ে অন্যত্র অবস্থান করলেও সম্প্রতি দুয়েকজন এলাকায় ফেরা শুরু করেছেন।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও মাদক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা জরুরি।’

টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হানিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, ‘শীর্ষ মাদক কারবারিদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে টেকনাফকে মাদকমুক্ত করতে।’

আরও পড়ুন

×