‘নদী হামার কিচ্ছু থোয় নাই, সইগ শ্যাষ করি দিচে’
ছবি- সমকাল
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৪২ | আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৬ | ১৭:৪৫
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা বৃষ্টিতে গাইবান্ধার তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি দ্রুত বাড়ছে। এরই মধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙনে শত শত ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও বিভিন্ন স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও অসংখ্য বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন নদীতীরবর্তী এলাকার বাসিন্দারা।
ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব রসুলপুরের সাইভান বেওয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘নদী হামার কিচ্ছু থোয়নাই বাহে, পাঁচ-সাত বিঘা আবাদি জমি ছিল, সেটাও শ্যাষ। নদী হামার সইগ শ্যাষ করি দিচে। কেউ একনা খোঁজখবরও নিব্যার আসেনাই।’
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপৎসীমার ৩০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বাড়তে থাকলে তা বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে ব্রহ্মপুত্র নদ ফুলছড়ির তিস্তামুখ পয়েন্টে ১৩ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ৮৫ সেন্টিমিটার নিচে রয়েছে। ঘাঘট নদীর পানি শহরের নতুন ব্রিজ পয়েন্টে ১২ সেন্টিমিটার কমে বিপৎসীমার ১৪২ সেন্টিমিটার নিচে এবং করতোয়া নদীর পানি গোবিন্দগঞ্জ পয়েন্টে ১২৭ সেন্টিমিটার বেড়ে বিপৎসীমার ২২৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখনো জেলার কোনো নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম না করলেও পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে বলে জানিয়েছে পাউবো।
গত এক সপ্তাহে সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলায় নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এতে অন্তত ৮০০ পরিবার গৃহহীন হয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে শত শত বিঘা আবাদি জমি, সবজিক্ষেত ও বসতভিটা। ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে স্কুল, মাদ্রাসা, দোকানপাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া, হরিপুর ও চণ্ডীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চল। এসব এলাকায় দুই শতাধিক পরিবারের বসতভিটা এবং দেড় শতাধিক বিঘা আবাদি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে।
কাপাসিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনজু মিয়া বলেন, গত দুই মাসের ভাঙনে প্রায় ১০০ বিঘা আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। একটি মাদ্রাসা নদীগর্ভে চলে গেছে এবং প্রায় ৭০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও এখন ভাঙনের মুখে। পানি উন্নয়ন বোর্ড কিছু জিও ব্যাগ ফেলেছে, তবে আরও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, চলতি মৌসুমে জেলার চারটি উপজেলায় অন্তত ২০টির বেশি স্থানে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। কোথাও ভাঙন তীব্র, কোথাও ইতোমধ্যে বসতবাড়ি, আবাদি জমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীতে বিলীন হয়েছে।
ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া, উড়িয়া ও ফজলুপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন চরাঞ্চলেও ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। চর চৌমোহনে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে অন্তত ২০০ পরিবার গৃহহীন হয়েছে। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে চৌমোহন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের পূর্ব রসুলপুর গ্রামের দিনমজুর মনোয়ারা বেগম বলেন, নদী ভাঙনে বাপের জমি, বসতভিটা সইগ গেছে। এখন স্বামীর বসতভিটা যেকনা ছিল, তাও শ্যাষ। বাড়ির সামনে সাত শতক জমিতে শাকসবজি আবাদ করছিলাম, তাও নদীর পেটত গ্যাচে।
ফজলুপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনছার আলী মণ্ডল জানান, ইউনিয়নের মধ্য ও দক্ষিণ খাটিয়ামারীর চর এবং চর চৌমোহনসহ কয়েকটি এলাকায় ৪০০ থেকে ৫০০ পরিবার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে সদর উপজেলার মোল্লারচর ইউনিয়নের সিধাইল এলাকায় অন্তত ৩০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে সিধাইল কওমি মাদ্রাসাসহ আরও অনেক বাড়িঘর।
রংপুর আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধাসহ কয়েকটি জেলায় আগামী তিন থেকে চার দিন টানা বৃষ্টিপাত হতে পারে। মৌসুমি বায়ু আরও সক্রিয় হলে বৃষ্টির পরিমাণ বাড়তে পারে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার নদীতীরবর্তী অঞ্চল ও চরাঞ্চলের ২০ থেকে ২৫টি স্থানে ভাঙন শুরু হয়েছে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের কাজ চলছে।
