রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
ছাত্রী হলে গণরুমের বিড়ম্বনা
আবাসন সংকটের কারণে গাদাগাদি করে হলে বসবাস করছেন ছাত্রীরা সমকাল
সিনথিয়া ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
রাত নামলেই বাড়ে চুলকানি। ঘুম ভেঙে যায় অসহ্য যন্ত্রণায়। হাতের আঙুলের ফাঁক থেকে শুরু হয়ে ক্ষত ছড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। কেউ লুকিয়ে মলম মাখেন। কেউ আবার লোকলজ্জায় চিকিৎসা নিচ্ছেন না। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের আবাসিক হলগুলোতে এখন নীরব আতঙ্কের নাম ‘স্ক্যাবিস’ বা খোসপাঁচড়া। আবাসন সংকটের কারণে গাদাগাদি করে বসবাস, অপর্যাপ্ত শৌচাগার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই ছোঁয়াচে চর্মরোগ। সবচেয়ে বেশি ভুগছেন গণরুমে থাকা প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে এক মাসে ১২২ শিক্ষার্থী স্ক্যাবিসে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। তবে সংশ্লিষ্টদের ধারণা, আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা এর তিন থেকে চার গুণ। কারণ অনেক শিক্ষার্থী বাইরে চিকিৎসা নিচ্ছেন, কেউ রোগ গোপন করছেন, আবার কেউ এটিকে সাধারণ চুলকানি ভেবে অবহেলা করছেন।
মেডিকেল সেন্টারের প্রধান চিকিৎসক ডা. লুমান মঞ্জুর জানান, প্রতিদিন যে সংখ্যক ছাত্রী চর্মরোগের ওষুধ নিতে আসছেন, তা নজিরবিহীন। গত বছরের এই সময়ের তুলনায় এবার স্ক্যাবিস আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। চিকিৎসকরা সাধ্যমতো চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন।
মন্নুজান, তাপসী রাবেয়া, রোকেয়া, রহমতুন্নেছা ও বেগম খালেদা জিয়া হল ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ গণরুমে ধারণক্ষমতার কয়েক গুণ শিক্ষার্থী। অনেককে মেঝেতে বিছানা পেতে রাত কাটাতে হচ্ছে। পুরোনো ভবনের স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, কম আলো-বাতাস ও অপরিষ্কার শৌচাগার পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। অনেক হলে ২৫ থেকে ৩০ জন ছাত্রীর জন্য রয়েছে মাত্র একটি বা দুটি শৌচাগার।
মন্নুজান হলের গণরুমের কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রথমে হাতে ছোট ছোট ফুসকুড়ি হয়েছিল। পরে তা শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ওষুধ খেলেও পুরোপুরি ভালো হচ্ছে না। কারণ একই কক্ষে সবাই গাদাগাদি করে থাকেন। একজন ভালো হলেও আরেকজন থেকে আবার সংক্রমণ হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে আবাসন সংকট নিয়ে আলোচনা হলেও কার্যকর সমাধান আসেনি। নতুন হল নির্মাণের ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। স্বাস্থ্যঝুঁকি দিন দিন বাড়ছে। তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে হলগুলো বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকটের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
বেগম খালেদা জিয়া হলের এক আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, ‘রাতে চুলকানির যন্ত্রণা এত বেড়ে যায় যে ঘুমানো যায় না। চুলকাতে চুলকাতে অনেক সময় রক্ত বের হয়। এখন ক্ষতস্থানে ইনফেকশনও হয়েছে। পড়াশোনা করতে পারছি না।’
তাপসী রাবেয়া হলের এক শিক্ষার্থী জানান, তীব্র গরমে পরিবেশ সব সময়ই আর্দ্র ও অস্বাস্থ্যকর থাকে। ২৪ ঘণ্টা সিলিং ফ্যান চললেও গরম কমে না। এতে চুলকানি ও অস্বস্তি আরও বাড়ে। একই বিছানা বা বালিশ অনেক সময় ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়। একজন আক্রান্ত হলে পুরো কক্ষে রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রের চর্ম ও যৌনরোগ বিভাগের কনসালট্যান্ট ডা. মাসিউল আলম হোসেন বলেন, স্ক্যাবিস অত্যন্ত ছোঁয়াচে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত কাপড়, বিছানা, তোয়ালে বা সরাসরি সংস্পর্শ থেকে এটি দ্রুত ছড়ায়। গাদাগাদি পরিবেশ ও অপরিচ্ছন্নতা সংক্রমণের বড় কারণ। তিনি আরও বলেন, আক্রান্ত হওয়ার পর শুধু একজন চিকিৎসা নিলে হবে না। একই কক্ষের সবাইকে একসঙ্গে চিকিৎসা নিতে হবে। পাশাপাশি কাপড় ও বিছানাপত্র গরম পানিতে ধুয়ে রোদে শুকাতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা আবাসন সংকট এখন স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-সহ বিভিন্ন গবেষণায়ও ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় স্ক্যাবিস সংক্রমণের ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রহমতুন্নেছা হলের এক শিক্ষার্থী জানান, গণরুমে তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করার পর সাধারণ কক্ষে সিট পাওয়া গেলে কিছুটা স্বস্তি আসে। কিন্তু ততদিনে শরীরে ত্বকের স্থায়ী ক্ষতি হয়ে যায়।
আবাসন সংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়ে জানতে চাইলে মন্নুজান হলের প্রভোস্ট আশিয়ারা খাতুন বলেন, হলে আবাসন সংকট আমাদের একটি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীর তুলনায় আসন সংখ্যা অনেক কম হওয়ায় মানবিক কারণেই নবাগত ছাত্রীদের গণরুমে জায়গা দিতে হচ্ছে। তবে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে এবং হলের সার্বিক পরিবেশ উন্নত রাখতে হল প্রশাসন নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনের কথাও ভাবছেন তারা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর
রহমান বলেন, চর্মরোগের ব্যাপকতা সম্পর্কে প্রশাসনের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানালে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
- বিষয় :
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়