নিরীহ ব্যক্তিদের কললিস্টের সূত্রে হয়রানির অভিযোগ
জামায়াত নেতা নুরু হত্যা
কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১০
| প্রিন্ট সংস্করণ
লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে জামায়াতে ইসলামীর ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা নুরুল আলম নুরু হত্যা মামলায় নিরীহ ব্যক্তিদের আসামি করে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। মামলাটির সুষ্ঠু তদন্ত করে তাদের মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার দাবিতে গতকাল শনিবার মানববন্ধন করেন এলাকাবাসী। এতে হত্যারহস্য উন্মোচনের আহ্বান জানান বক্তারা।
উপজেলার চরকাদিরা ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ডে আয়োজিত মানববন্ধনে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা ছাড়াও এলাকার কয়েকশ নারী-পুরুষ অংশ নেন। নিহত নুরুল আলম নুরু (৩৬) ছিলেন সাহেবেরহাট ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক। ১৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় তিনি নিখোঁজ হন। ১৯ জানুয়ারি সকালে মাতাব্বরহাট মেঘনা নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধের সিসি ব্লকের ওপরে পাওয়া যায় তাঁর মরদেহ। এ ঘটনায় পরদিন মামলা করেন নুরুর মা ফাতেমা বেগম।
পুলিশ নুরুর মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে দেখতে পায়, নুরুন্নাহার পাখি নামের এক নারীর মোবাইল ফোন নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগ হয়েছিল নুরুর। এর সূত্র ধরেই ১৯ জানুয়ারি রাতে পাখি, তাঁর চাচা জহিরুল ইসলাম (৪২) ও ফুফা কামাল হোসেনকে (৪০) আটক করা হয়। পরে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। তিন মাস ১৬ দিন কারাভোগের পর সম্প্রতি তারা জামিনে ছাড়া পান। আদালতের নির্দেশে মামলাটি তদন্ত করছে জেলা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
গতকালের মানববন্ধনে মামলাটির প্রধান আসামি নুরুন্নাহার পাখি বলেন, বছরখানেক আগে রং নাম্বার থেকে নুরু তাঁর মোবাইল ফোনে কল দেন। কথা বলতে বলতে তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। ১৯ জানুয়ারি নুরুর ফোন বন্ধ পেয়ে তিনি খোঁজ নেওয়ার জন্য কয়েকবার চেষ্টা করেন। তিনি যদি অপরাধী হতেন, তবে মোবাইল ফোন খোলা রেখে বাড়িতে থাকতেন না। বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ইটভাটা শ্রমিক স্বামী ও সাত বছরের মেয়েকে নিয়ে সংসার চালাতে পারছেন না। জামিনের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা সম্পূর্ণ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন বলেও জানান তিনি।
অপর আসামি দিনমজুর জহিরুল ইসলামের পরিবারে ৮২ বছরের অন্ধ মা, স্ত্রী ও সন্তান আছে। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমি নুরুকে কোনো দিন দেখি নাই, চিনিও না। পুলিশ বলছে, আমার ভাতিজি পাখির নম্বরের সঙ্গে আমার নম্বরে যোগাযোগ ছিল। ভাতিজির সঙ্গে ফোনে কথা বলাটাই কি আমার অপরাধ? সাড়ে তিন মাস বিনা অপরাধে জেল খাটলাম।’ জামিনের জন্য একমাত্র সম্বল ঘরের ভিটেটুকুও বিক্রি করতে হয়েছে তাঁকে।
মামলার তিন নম্বর আসামি কামাল হোসেনের ঘরে পঙ্গু সন্তান, বিয়ের উপযুক্ত মেয়ে ও স্ত্রী। তাঁর জামিনের খরচ চালানোর জন্য ১০ শতাংশ বসতভিটা বিক্রি করতে হয়েছে। কামাল বলেন, ‘এখন দুই চোখে অন্ধকার দেখছি। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খালাস না পেলে আত্মহত্যা করা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ থাকবে না।’
মানববন্ধনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক ও বিশিষ্টজন বলেন, আসামিরা সবাই পেশায় দিনমজুর, নিরীহ মানুষ। কললিস্টের ওপর ভিত্তি করে তাদের এভাবে হত্যা মামলায় জড়ানো দুঃখজনক। আসল অপরাধীরা যাতে পার না পায় এবং এই পরিবারগুলো যেন আইনি হয়রানি থেকে মুক্তি পায়, সেজন্য মামলাটি পুনঃতদন্তের দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে নুরুর নিকটাত্মীয় ও সাহেবেরহাট ইউনিয়ন জামায়াতে ইসলামীর আমির মো. লোকমান হোসেন বলেন, ‘ওই তিনজনই নুরুর হত্যাকারী এটা আমরা নিশ্চিত করে বলছি না। নুরুর ব্যবহৃত মোবাইলে এক নারীর যোগাযোগ থাকার সূত্র ধরে পুলিশ প্রথমে পাখিকে ও পরে তাঁর আত্মীয় দুইজনকে আটক করে। সেই হিসেবে তাদের আসামি করা হয়েছে। তারা তিনজনই এজাহারভুক্ত আসামি, এখন জামিনে আছেন। তবে, তারা খুবই নিরীহ। পেশায় ইটভাটার শ্রমিক।’ তিনি মনে করেন, তদন্তকারী সংস্থার উচিত নুরু হত্যার প্রকৃত কারণ ও আসল দোষীদের খুঁজে বের করা। এই তিনজন যদি সত্যিই নিরপরাধ হন, তবে দ্রুত তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া উচিত।
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি লক্ষ্মীপুরের পরিদর্শক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, তারা মামলাটি সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে তদন্ত করছেন। সিআইডি প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করলেও কেবল ‘কল লিস্ট’ বা ‘সিডিআর’ দেখে কাউকে চূড়ান্ত অপরাধী বিবেচনা করে না। ঘটনার নেপথ্যের কারণ ও পারিপার্শ্বিক সব তথ্য-প্রমাণ খতিয়ে দেখছেন। নিরীহ কেউ যাতে আইনি হয়রানির শিকার না হন, প্রকৃত অপরাধী যেন কোনোভাবেই পার না পায়, তা নিশ্চিত করাই লক্ষ্য। তদন্তে এই তিনজনের সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ততা পাওয়া না গেলে আইন অনুযায়ী মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করবেন।
- বিষয় :
- হত্যা