নাসিরনগর উপজেলার শিক্ষাবঞ্চনা
হাতে উঠছে না কলম, স্কুলে পড়ছে না পা
শিশুরা স্কুলে না গিয়ে খেলা করছে। সাংবাদিক পরিচয় দিতেই সবাই ছবি তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করে। তাদের মধ্যে সাদা শার্ট পরা ছেলেটি (পেছনে) স্কুলে পড়ে। বাকিদের কেউই স্কুলের বারান্দায় যায়নি। সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ফান্দাউক ইউনিয়নের রাজনগর-রসুলপুর গ
মুরাদ মৃধা, নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া)
প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪৩
| প্রিন্ট সংস্করণ
সকাল সাড়ে ৯টা। অন্য এলাকার শিশুরা স্কুলের বেঞ্চে বসে পাঠ নিচ্ছে। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার রাজনগর-রসুলপুর গ্রামের ১০ বছর বয়সী সজীব ও রাজিব মাথায় ধানের আঁটি নিয়ে হাঁটছে ক্ষেতের দিকে। স্কুলে না গিয়ে কেন মাঠে–প্রশ্ন করতেই সজীবের সরল উত্তর, ‘যাওনের তো মন চায়, কিন্তু গেরামে কোনো ইশকুল নাই। তাই আব্বার লগে ক্ষেতে কাম করি।’
সজীব-রাজিবের গল্প ব্যতিক্রম নয়। নাসিরনগরের অন্তত ১২টি গ্রামে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার শিশু নিয়মিত শিক্ষার বাইরে রয়েছে। তাদের অনেকেই কৃষিকাজ, হোটেল-রেস্তোরাঁ, কারখানা কিংবা বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় যুক্ত হচ্ছে। মেয়েশিশুদের একটি বড় অংশ ঝুঁকিতে পড়ছে বাল্যবিয়ের।
বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস
৭৫ বছর বয়সী খোরশেদ মিয়া বলেন, ‘ছোটবেলায় হুনছি বাপ-দাদারা কেউ লেহাপড়া করে নাই। আমিও পড়ি নাই। ভাবছিলাম নাতি-পুতিরে অন্তত কলম ধরাডা শিখামু। সেই আশায় ৩৩ বছর আগে সরকাররে ৩৩ শতক জমি দিছিলাম। পরে আরও দুইবার জমি দেওয়া হইছে। সরকার জমি নিছে ঠিকই, কিন্তু ইশকুল আর দিল না।’
রাজনগর-রসুলপুর প্রায় চার থেকে পাঁচশ বছরের পুরোনো জনপদ। প্রায় পাঁচ হাজার মানুষের বসবাস। শুষ্ক মৌসুমে ইউনিয়ন সদরে যেতে হয় হেঁটে, বর্ষায় নৌকায়। নিকটতম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় তিন থেকে চার কিলোমিটার দূরে। ফলে অনেক শিশুই কখনও বিদ্যালয়ের মুখই দেখে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ১৯৯৩ সালে গ্রামের স্কুলশিক্ষক জিতু মিয়া ও খোরশেদ মিয়ার স্বজনদের দেওয়া ৩৩ শতক জমিতে একটি টিনশেড ঘর তুলে অস্থায়ীভাবে পাঠদান শুরু হয়েছিল। কয়েক মাসের মধ্যেই সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ২০০০ থেকে ২০১২ সালে আহাদ মিয়া ও কুতুব উদ্দিনের স্বজনরা আরও ৩৩ শতক জমি সরকারকে লিখে দেয়। বিদ্যালয়ের জন্য দেওয়া এসব জমির ওপর এক ব্যক্তি দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছেন।
ফান্দাউক ইউনিয়ন ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মো. হারুন মিয়া জানান, কয়েক মাস ধরে তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। রাজনগর-রসুলপুর গ্রামের বিদ্যালয়ের জমি দখলসংক্রান্ত কোনো অভিযোগ তাদের কার্যালয়ে আসেনি। আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ দেওয়া হয়ে থাকলে সেটি খতিয়ে দেখা হবে। অনিয়মের প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফান্দাউক ইউপি চেয়ারম্যান ফারুকুজ্জামান বলেন, ‘বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক ও সড়কের জন্য বহুবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছি। এখনও কোনো বরাদ্দ পাইনি।’
পরিসংখ্যানের চোখে শিক্ষার চিত্র
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ইপিআই কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, ৪ থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৬৫ হাজার। অথচ সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজার। অর্থাৎ প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার শিশু কোনো শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গেই যুক্ত নয়। তাদের মধ্যে প্রায় ১০ হাজারই মেয়ে।
উপজেলার ১২৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী প্রায় ৩২ হাজার। ১৩০টি এনজিও পরিচালিত শিখনকেন্দ্রে রয়েছে ৩ হাজার ৯০০ জন। সাতটি আলিয়া মাদ্রাসার ইবতেদায়ি স্তরে প্রায় ১ হাজার ৮০০ এবং ৭০টি কওমি মাদ্রাসা ও ১০টি নূরানি মক্তবে ১০ হাজার শিশু পড়াশোনা করছে।
অভাবের সংসার ও শৈশবেই শ্রমের হাতছানি
সরেজমিনে বিদ্যালয়বিহীন বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, স্কুলে যাওয়ার বয়সী বহু শিশু পরিবারের সঙ্গে কৃষিকাজ করছে। কেউ কেউ চলে যাচ্ছে ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরে শ্রমিক হিসেবে।
ভলাকুট ইউনিয়নের মোহন মিয়া জানায়, পরদিনই সে ঢাকায় যাবে বিরিয়ানি বিক্রির কাজে। তার ভাষায়, ‘ঢাকা গিয়া বিরানি বেচুম।’ কুন্ডা ইউনিয়নের ১৪ বছর বয়সী রিফাত বলে, ‘ইস্কুল না থাকায় আর অভাবের কারণে পড়ালেখা অইলো না। এহন সারাজীবন কামই করতে অইব।’ রানিয়াচং আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মফিজ মিয়া বলেন, ‘আশ্রয়ণে একটা ইস্কুল থাকলে আমার ছেলেটারে জমিতে কামে পাঠাইতে হইত না।’
বিকাশ বাধাগ্রস্ত ও সামাজিক ঝুঁকির আশঙ্কা
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অল্প বয়সে শ্রমে যুক্ত হওয়া শিশুদের শারীরিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ গভীরভাবে ব্যাহত হয়।’
হাওরাঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করছেন সিলেট শাহজালাল প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বর্তমানে মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক। তিনি বলেন, একটি উপজেলায় প্রায় ১৮ হাজার শিশু প্রাথমিক শিক্ষার বাইরে থাকা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
তাঁর মতে, আরও উদ্বেগের বিষয় হলো–মোট শিশুর অর্ধেকের বেশি এখনও সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার আওতার বাইরে। এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষাবঞ্চিত শিশুকে দ্রুত মূলধারায় ফিরিয়ে আনা না গেলে ভবিষ্যতে তারা অর্থনৈতিক বোঝার পাশাপাশি সামাজিক বৈষম্য, অস্থিরতা ও অপরাধপ্রবণতার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে।
ঝুঁকি মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ের কাজ
ইউনিসেফের সহায়তায় পরিচালিত এফআইভিডিবির প্রকল্প সমন্বয়ক দিদারুল ইসলাম বলেন, ১৩০টি শিক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ছয় হাজার ঝরে পড়া শিশুকে আবার পড়াশোনায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে উপজেলায় ১৭৭ জন কন্যাশিশু বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে রয়েছে। পাশাপাশি ২২৭ জন শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিতে। এসব শিশুর সুরক্ষা ও ঝরে পড়া রোধে তাদের দল মাঠপর্যায়ে কাজ করছে।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস জানিয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ‘বিদ্যালয়বিহীন এলাকায় ১ হাজার ৫০০ প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন’ প্রকল্পে নাসিরনগরের ১২টি গ্রামের তালিকা পাঠানো হয়েছিল। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ায় কাজ এগোয়নি। সম্প্রতি নতুন করে আবারও প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ইসহাক মিয়া বলেন, ‘প্রকল্প অনুমোদন পেলেই বিদ্যালয় নির্মাণের কাজ শুরু হবে।’
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামসুর রহমান বলেন, দুটি প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়বিহীন ১২টি গ্রামের তালিকা পাঠানো হয়েছিল। প্রকল্প দুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় নতুন করে তালিকা পাঠানো হয়েছে। তবে উপজেলায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে–এমন তথ্যের সঙ্গে তিনি একমত নন। তাঁর ভাষ্য, অনেক শিশু কিন্ডারগার্টেনে পড়ছে। বিদ্যালয়ের বাইরে কিছু শিশু থাকলেও সংখ্যাটি এত বেশি নয়।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব রেবেকা সুলতানা বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে উন্নয়ন শাখার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নান বলেন, ‘কোনো গ্রাম বিদ্যালয়বিহীন থাকবে না। একটি শিশুও যেন বিদ্যালয়ের বাইরে না থাকে, সে লক্ষ্যেই কাজ করছি। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তালিকা পাঠানো হয়েছে।’
- বিষয় :
- শিক্ষা