ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

৩৫০০ কোটি টাকার উন্নয়নেও বৃষ্টিতে ডুবে যায় বগুড়া

৩৫০০ কোটি টাকার উন্নয়নেও বৃষ্টিতে ডুবে যায় বগুড়া
×

প্রতিবছর বর্ষায় দুর্ভোগে পড়েন বগুড়াবাসী। গত বৃহস্পতিবার বৃষ্টিতে তলিয়ে যায় শহরের প্রধান সড়ক সমকাল

লিমন বাসার, উত্তরাঞ্চল

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০০

| প্রিন্ট সংস্করণ

মাত্র কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতেই আবারও অচল হয়ে পড়েছে বগুড়া শহর। সাতমাথা, স্টেশন রোড, কবি নজরুল ইসলাম সড়ক, শেরপুর রোড, পার্ক রোড, খান্দার, গালাপট্টি, টেম্পল রোড, ফতেহ আলী বাজার, চকযাদু, কাটনারপাড়া, বড়গোলাসহ অন্তত এক ডজন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মার্কেট হাঁটু থেকে কোমরপানিতে তলিয়ে গেছে। যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, দোকানপাটে পানি ঢুকে পড়েছে। অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে ছিল। 

এ দৃশ্য নতুন নয়। প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগে পড়ে নগরবাসী। তবে এবার নতুন করে সামনে এসেছে আরেকটি প্রশ্ন–বগুড়া সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, পৌরসভা থাকাকালে গত ১৭ বছরে ড্রেন, সড়ক, ফুটপাত ও স্ট্রিটলাইটসহ অবকাঠামো উন্নয়নে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর বড় অংশই ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারে। এত বিপুল ব্যয়ের পরও কেন সামান্য বৃষ্টিতেই শহর অচল হয়ে পড়ে?

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সমস্যার মূল কারণ শুধু ড্রেনের অভাব নয়; বরং অপরিকল্পিত ড্রেন নির্মাণ, কার্যকর আউটফল না থাকা, ড্রেনগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের পথ দখল হয়ে যাওয়া।
পৌরসভার দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন অনুযায়ী ড্রেন নির্মাণ হয়েছে। কিন্তু পুরো শহরকে একটি সমন্বিত ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। অনেক ড্রেনের শেষ প্রান্তে কার্যকর পানি নিষ্কাশনের পথ নেই।’
সিটি করপোরেশনের তথ্যে দেখা যায়, নগরে প্রায় ৯৯১ কিলোমিটার সড়কের বিপরীতে ড্রেন রয়েছে প্রায় ৯০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৪০০ কিলোমিটারই কাঁচা। পুরোনো ১২টি ওয়ার্ডের অধিকাংশ ড্রেনের প্রস্থ মাত্র দুই ফুট, যা বর্তমান নগরায়ণের চাপ সামলাতে পারছে না।

মালগ্রাম, নারুলী, সেউজগাড়ি, কৈপাড়া, বাদুরতলা, খান্দার, চেলোপাড়া ও কাটনারপাড়ায় দেখা গেছে, অনেক ড্রেন ভাঙা, কোথাও দেয়াল ধসে মুখ সংকুচিত হয়েছে, কোথাও প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্যে পানি চলাচল বন্ধ। বছরের পর বছর পলি অপসারণ না করায় অনেক ড্রেনের ধারণক্ষমতাও কমে গেছে। সেউজগাড়ির বাসিন্দা রাকিবুল হাসান বলেন, ‘আমরা প্রথম শ্রেণির কর দিই, কিন্তু নাগরিক সুবিধা পাই না। প্রতি বছর একই অবস্থা।’ আমিনুল ইসলাম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘বৃষ্টি হলেই দোকানে পানি ঢোকে, রাস্তায় চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এত উন্নয়ন হলো, দুর্ভোগ কমল না।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন শুধু নতুন প্রকল্প ঘোষণা নয়, গত দুই দশকে ড্রেন নির্মাণ, সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে কোথায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং তার কার্যকারিতা কী–সেটিরও স্বাধীন মূল্যায়ন প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনাবিদ আব্দুল হামিদ বলেন, শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণে সমস্যার সমাধান হবে না। শহরের উচ্চতা, খাল, নিম্নাঞ্চল, পানিপ্রবাহের দিক এবং চূড়ান্ত নিষ্কাশন পথ বিবেচনায় একটি আধুনিক ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান জরুরি।

জেলা সুপ্র সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, ‘বগুড়া এখন সিটি করপোরেশন। নাগরিকদের প্রত্যাশাও বেড়েছে। প্রতি বর্ষায় যদি একইভাবে শহর ডুবে যায়, তাহলে উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।’
নতুন ঘোষিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী আবু হেনা বলেন, শহরের সব ড্রেন এখনও একই নেটওয়ার্কে যুক্ত নয়। অনেক জায়গায় প্রধান ড্রেনের সঙ্গে শাখা ড্রেনের সংযোগ দুর্বল এবং কার্যকর আউটফল নেই। এ কারণে এক এলাকার পানি অন্য এলাকায় গিয়ে নতুন করে জলাবদ্ধতা তৈরি করছে।
সিটি প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, ‘ড্রেনের প্রকৃত অবস্থা সরেজমিনে দেখে আমিও বিস্মিত হয়েছি। পরিকল্পিতভাবে বড় ড্রেন নির্মাণ এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
 

আরও পড়ুন

×