ত্রিপুরা পাড়াবাসীর আকুতি
‘আর ভাঙবেন না বাপ-দাদার ভিটে’
টিলা কাটার প্রভাবে এভাবেই ভারী বর্ষণে ধসে পড়ছে মাধবপুরের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ত্রিপুরা পল্লির পাহাড়ি অংশ। বৃহস্পতিবার তোলা সমকাল
মাধবপুর (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
টানা বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে আবারও ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান-সংলগ্ন ত্রিপুরা পাড়া ও বন এলাকা। ভাঙন ক্রমেই ভয়াবহ আকার ধারণ করায় প্রচণ্ড আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয় ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠীর বাসিন্দারা।
এ অঞ্চলে বসবাসকারী ত্রিপুরা গোষ্ঠির বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত ১৫ বছর বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে আবেদন করেও স্থায়ী কোনো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিশ্চত করা যায়নি তাদের বসতভিটা রক্ষায়। ফলে প্রতি বর্ষায় নতুন নতুন এলাকা বিলীন হচ্ছে।
স্থানীয়দের দাবি, অতীতে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন ও বিক্রির কারণে এলাকার মাটি দুর্বল হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই বর্ষা মৌসুমে ভাঙনের মাত্রা বাড়তে থাকে। গত ১০ বছরে অন্তত পাঁচটি বসতবাড়ি সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে। বর্তমানে আরও কয়েকটি বাড়ি চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ত্রিপুরা পাড়ার হেডম্যান (পাড়া প্রধান) চিত্র দেববর্মা জানান, ভাঙন রোধে উপজেলা প্রশাসন, বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে বহুবার লিখিত আবেদন করা হয়েছে। জনপ্রতিনিধিদের কাছেও বিষয়টি বারবার তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও স্থায়ী কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি। সাময়িক আশ্বাস মিললেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজ দেববর্মাসহ অন্যরা জানান, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান দেশের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ এবং জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। অথচ এর পাশেই বসবাসরত ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ বছরের পর বছর ভাঙনের আতঙ্ক নিয়ে জীবনযাপন করছেন। বিভিন্ন সময় বন ও টিলা বিধ্বংসী বিভিন্ন কাজের কারণে ভাঙনের প্রবণতা বাড়লেও এসব বন্ধে কেউ পদক্ষেপ নিচ্ছে না। তাদের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে গাইড ওয়াল নির্মাণ, তীর সংরক্ষণ এবং স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হোক।
সমীরণ নামে এক বাসিন্দা বলেন, তিনি ও তাঁর বাপ-দাদার ভিটেমাটি হারাতে চান না। সরকার পদক্ষেপ নিলে তারা সহায়তা করবেন বাস্তবায়নের। দ্রুত গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হলে তাদের বসতভিটা রক্ষার ব্যবস্থা করুক। সময় মতো ব্যবস্থা না নিলে আরও বড় ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
এ বিষয়ে সাতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মেহেদী মাসুদ জানান, ভাঙনের বিষয়টি বন বিভাগের নজরে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চুনারুঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গালিব চৌধুরী বলেন, স্থানীয়দের আবেদন প্রশাসনের নজরে রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের লক্ষ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছেও বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।
স্থানীয়দের মতে, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের পরিবেশ, পর্যটন এবং ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের নিরাপদ বসবাস– এ তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।
- বিষয় :
- পাহাড়