ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

ক্ষুধা, তৃষ্ণা নিয়ে সাগরে তিন দিন ভেসে ছিলেন আল আমিন

ক্ষুধা, তৃষ্ণা নিয়ে সাগরে তিন দিন ভেসে ছিলেন আল আমিন
×

সাগর থেকে উদ্ধার হওয়া আল আমিন হাওলাদার (৪২) গলাচিপা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ছবি: সমকাল

পটুয়াখালী প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১৯:০১

গভীর বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে ছোট্ট একটি ফিশিং বয়া আঁকড়ে তিন দিন ধরে ভেসে ছিলেন আল আমিন হাওলাদার (৪২)। চারদিকে শুধু পানি, মাথার ওপর খোলা আকাশ, পেটে একফোঁটা খাবার নেই। একে একে সঙ্গীরা হারিয়ে যাচ্ছেন ঢেউয়ের তোড়ে। ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়লেও তিনি আশা ছাড়েননি। তিন দিন পর বুধবার সন্ধ্যায় ভোলার ঢালচর এলাকার কাছে স্থানীয় জেলেরা তাকে উদ্ধার করেন।

পরে তাকে প্রথমে চরফ্যাশন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে স্বজনেরা বৃহস্পতিবার রাতে তাকে গলাচিপা উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে আসেন। আল আমিন উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের ইছাদি গ্রামের চান্দু হাওলাদারের ছেলে।

জীবিকার তাগিদে গত ৪ জুলাই আরও ১০ জন জেলেকে নিয়ে ইলিশ শিকারে গভীর সমুদ্রে যান তিনি। রাতের দিকে কুয়াকাটা উপকূলের পূর্ব-দক্ষিণে মাছ ধরার সময় হঠাৎ প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের ট্রলারটি ডুবে যায়।

আল-আমিন হাওলাদার বলেন, জীবিকার তাগিদে আমরা ১১ জন জেলে গভীর সমুদ্রে ইলিশ শিকারে যাই এবং ঘটনার দিন রাতে কুয়াকাটা থেকে পূর্ব-দক্ষিণে গভীর সাগরে জাল ফেলছিলাম। এ সময় হঠাৎ প্রচন্ড ঝড় শুরু হয় এবং ঝড়ের কবলে ট্রলারটি ডুবে যায়। এ সময় ট্রলার মালিক এমাদুল সিকদার ও আমিসহ ৮ জন ট্রলারের বাইরে থাকায় সহজেই বের হতে পেরেছিলাম। তবে ট্রলারের ভেতরে কেবিনে থাকায় ফোরকান হাওলাদার ও তার ছেলে সায়েম হাওলাদার এবং পানপট্টি এলাকার এবাদুল হক বের হতে পারেননি।

তিনি আরও বলেন, সাগরের ঢেউয়ে এক সময় ট্রলার মালিক এবাদুল সিকদার, নাজমুল আলম, মোহাম্মদ বায়েজীদ, শাকিল আহমেদ, রাকিব আমাদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং আকাশ, হারুন ও আমি ডুবন্ত ট্রলারের একটি অংশ এবং বয়া আঁকড়ে ধরে ভাসতে থাকি। দুই দিন পর আমাদের ট্রলারের ভিতর থেকে ফোরকান ও এবাদুলের মরদেহ বের হয়ে সাগরে ভাসতে দেখে কান্না করতে থাকি। পরে কান্না বন্ধ করে নিজে বাঁচার যুদ্ধ শুরু করি।

আল আমিন আরও বলেন, উত্তাল ঢেউয়ে এবার হারুন ও আকাশও আমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান। বেঁচে থাকার জন্য একটি ছোট্ট ফিশিং বয়া পেটের নিচে চেপে ধরে একাই ভাসতে থাকি উত্তাল সমুদ্রে। কিন্তু তিন দিনের ক্ষুধার যন্ত্রণায় চোখে-মুখে অন্ধকার দেখেছি এবং ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসে শরীর। শেষ পর্যন্ত সাগরে ভাসতে ভাসতে বুধবার সন্ধ্যা রাতে ভোলার ঢালচর নদ এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় জেলেরা আমাকে উদ্ধার করেন।

গজালিয়ার সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, বুধবার বিকেল ৩টার দিকে ভোলার শশীভূষণ থানা থেকে ৭০ কিলোমিটার দূরে ঢালচর থেকে আল আমিনকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে আল আমিন সুস্থ আছেন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা জহিরুন্নবী জানান, আল আমিনের শারীরিক অবস্থা দুর্বল হওয়ায় তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন তার সার্বিক খোঁজখবর রাখছে।

তিনি বলেন, ট্রলারে থাকা ১১ জেলের মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয়জন জীবিত উদ্ধার হয়েছেন। পাঁচজন এখনো নিখোঁজ। তাদের সন্ধানে কোস্ট গার্ড ও নৌপুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে প্রাথমিক আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হয়েছে।

গলাচিপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক বলেন, নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া ও নিখোঁজ জেলেদের পরিবারের পাশে প্রশাসন রয়েছে।

আরও পড়ুন

×