ঢাকা শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬

দ্য গার্ডিয়ানের নিবন্ধ

লড়াকু আর্জেন্টিনার দুর্বলতাও স্পষ্ট

লড়াকু আর্জেন্টিনার দুর্বলতাও স্পষ্ট
×

মেসিকে আলিঙ্গন কোচ স্কালোনির। ছবি: মার্কা

স্পোর্টস ডেস্ক

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৩৫ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ১৯:৪৮

আটলান্টার মাঠে লিওনেল মেসি হেঁটে বেড়াচ্ছেন, আর তার গাল বেয়ে পড়ছে অশ্রু। চলতি বিশ্বকাপে নিশ্চয় এটি স্মরণীয় এক মুহূর্ত। মাত্র কয়েক মিনিট আগে মিসরের কাছে দুই গোলে পিছিয়ে থেকে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ার দ্বারপ্রান্তে ছিল আর্জেন্টিনা। পেনাল্টি মিস করে ম্যাচের খলনায়ক বনে যাওয়ার শঙ্কায় ছিলেন মেসি। সেই খাদের কিনারা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে আর্জেন্টিনা। মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে তিন গোল দিয়ে পৌঁছে গেছে কোয়ার্টার ফাইনালে।

ম্যাচ শেষে এমন এক জয়ের আনন্দেই কাঁদছিলেন মেসি ও তার সতীর্থরা। এমনকি কাঁদছিলেন প্রধান কোচ লিওনেল স্কালোনি, যিনি ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকারে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ডাগআউটের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতেই স্কালোনি এক সাংবাদিককে বলেন, ‘আমি আপনার দিকে তাকাতেও পারছি না। আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি সত্যিই খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি।’

বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মতো আর কোনো দল এই বিশ্বকাপে সমর্থকদের আবেগে এত চড়াই-উতরাই উপহার দিয়েছে বলে মনে হয়না, যদিও টুর্নামেন্টে তাদের শুরুটা ছিল দুর্দান্ত। গ্রুপ পর্বের বাধা পার হয়েছে তেমন বেগ না পেয়েই।

৩৯ বছর বয়সে এসে মেসি যেন তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বিশ্বকাপ কাটাচ্ছেন। উদ্বোধনী ম্যাচে করেছেন হ্যাটট্রিক। তবে শেষ একাধিক ম্যাচে আর্জেন্টিনা বেশ জড়তা দেখিয়েছে। মিসরের সঙ্গে ম্যাচে যে ধাক্কা, সেটি মায়ামিতে কেপ ভার্দের বিপক্ষে শেষ ৩২-এর লড়াইয়ের তুলনায় কিছুই ছিল না বলে চলে। সেদিন খেলাধুলার ইতিহাসে বড় অঘটন থেকে আর্জেন্টিনা রক্ষা পেয়েছে। আর এসব পরিস্থিতি আর্জেন্টিনাকে নিয়ে নতুন করে কিছু প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

২৮ বছরের ট্রফি-খরা থেকে আর্জেন্টিনাকে মুক্ত করা এবং ব্যাক-টু-ব্যাক কোপা আমেরিকা জেতানোর কারণে স্কালোনি সেদেশে দেবতার মতো। এর ফলে সেখানে একটি অলিখিত সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, সাংবাদিকরা স্কালোনিকে খুব একটা কঠিন প্রশ্ন করেন না! কারণ তারা জয় ছাড়া আর্জেন্টিনার অন্য কিছু দেখেননি। তবে এই বিশ্বকাপে সেই চিত্র বদলে গেছে বলে মনে হচ্ছে। বেশ কয়েকটি সংবাদ সম্মেলনে সাধারণ কিছু প্রশ্ন নিয়েও স্কালোনিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ বা তর্কে জড়াতে দেখা গেছে।

স্কালোনির অধীনে আর্জেন্টিনার অনুশীলন। ছবি: দ্য গার্ডিয়াননকআউটের শ্বাসরুদ্ধকর দুটি ম্যাচ সম্পর্কে স্কালোনির দাবি, খেলা সবসময় দলের নিয়ন্ত্রণেই ছিল। কিন্তু সাধারণ দর্শকরা তার এই দাবি মানতে নারাজ। কারণ, কেপ ভার্দে সেদিন আর্জেন্টিনার সঙ্গে সমানে সমানে লড়েছে। মিসর তো ম্যাচের বেশ কিছু অংশে আর্জেন্টিনাকে পাত্তাই দেয়নি।

তবে এমন ঘটনা নতুন নয়, ২০২২ বিশ্বকাপেও আর্জেন্টিনা অন্তত চারবার এগিয়ে থেকে লিড হাতছাড়া করে, যার মধ্যে ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনাল ম্যাচটি ছিল অন্যতম। এই ধরনের ম্যাচ রূপকথার গল্পের জন্য দুর্দান্ত হতে পারে, কিন্তু সুসংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ সুইজারল্যান্ড দলের মুখোমুখি হওয়ার আগে তা খুব একটা আত্মবিশ্বাস জোগায় না। সুইসদের বিপক্ষে আর্জেন্টিনা যদি একবার লিড হাতছাড়া করে, তবে ম্যাচে ফিরে আসা তাদের জন্য অনেক বেশি কঠিন হতে পারে।

মাঠের বাইরের কিছু ঘটনাও আর্জেন্টিনার ওপর চাপ বাড়িয়েছে। মিসরের বিপক্ষে ম্যাচটি নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রে বাণিজ্যিক চুক্তিগুলোতে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশনকে (এএফএ) তদন্তের আওতায় নিয়েছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন। উত্তর আমেরিকায় এএফএ’র দূত টমাস রেগালাদো বলেছেন, ‘কেবল তদন্তের পদক্ষেপ নিয়ে কারও অপরাধ প্রমাণ করা যায় না।’

স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে অবশ্য এসব বিতর্কের কোনো প্রভাব নেই। আয়োজক দেশগুলো বাদে এই টুর্নামেন্টে আর্জেন্টিনাই সবচেয়ে বেশি দর্শক সমর্থন পাওয়া দল। দলটির যাত্রাপথ সমর্থকরা যেন ছায়ার মতো অনুসরণ করছে। গ্যালারিতে হাজার হাজার মানুষের একসঙ্গে গান গাওয়া, লাফানো এবং নাচের ছন্দবদ্ধ তরঙ্গ সত্যিই দেখার মতো দৃশ্য।

কোচ স্কালোনি তার রণকৌশল ও স্কোয়াড রোটেশনের (খেলোয়াড় পরিবর্তন) জন্যও সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কারণ তিনি এখনও প্রবীণ বা পুরোনো খেলোয়াড়দের ওপর বেশি ভরসা রাখছেন। মেসিকে হয়তো অনেকেই ‘চিরতরুণ বিস্ময়’ বলতে পছন্দ করেন, তবে কেপ ভার্দের সঙ্গে ম্যাচের পর যখন তিনি মিক্সড জোনে কথা বলতে আসেন, তখন তার কপালে কালশিটে দাগ স্পষ্ট দেখা যায়, যা ক্লান্তির কথাই জানান দেয়। এর কিছুক্ষণ পর মেসি বলেন, ‘ম্যাচে যারা আমাকে লাথি মেরে ক্ষতবিক্ষত করে, তারাই ম্যাচ শেষে আমার জার্সিটা চায়।’

সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে জিততে হলে আর্জেন্টিনাকে কেবল মেসি নয়, আরও অনেক কিছু করতে হবে। দীর্ঘ সময় আক্রমণের ক্ষীপ্রতা ধরে রাখতে হবে। এতোদিন তারা যেভাবে কেবল ‘ভাইবস’ বা মাঠের আবহ ও আবেগের ওপর ভর করে পার পেয়ে গেছে, সুইসদের বিপক্ষে তা নাও মিলতে পারে। তবুও অনেকের কাছে এই আর্জেন্টিনার ‘বিশৃঙ্খল শক্তি’ বা এলোমেলো ফুটবল ভালোবাসার আসল কারণ। হয়তো স্কালোনি নিজেও তাদের একজন।

মিসরের সঙ্গে ম্যাচের পর আবেগজড়িত কণ্ঠে স্কালোনি বলেছিলেন, ‘ফুটবল এটাই—এখানে কেবল কৌশল শেষ কথা নয়। ওসবের গুরুত্ব অবশ্যই আছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই; কিন্তু আমাদের যদি লড়াকু মানসিকতা না থাকত, তবে আমরা টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়তাম।’

আরও পড়ুন

×