ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী: প্রধানমন্ত্রী
শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: ফোকাস বাংলা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ২০:০৮
ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যবাহী ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ‘ডিএমসি ডে’ বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। ১৯৪৬ সালের এই দিনে মাত্র ১০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি আজ দেশের চিকিৎসাসেবার প্রধানতম ভরসাস্থল।
শনিবার সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের আয়োজনে ডা. শামসুল আলম খান মিলন মিলনায়তনে আয়োজিত মূল অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন তার সহধর্মিণী ও এই কলেজের ৪৩তম ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থী, কার্ডিওলিস্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
প্রধানমন্ত্রী নিজে গাড়ি ড্রাইভ করে তার সহধর্মিণীকে নিয়ে মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে আসেন। প্রথমে বেলুন উড়িয়ে দিবসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর তারা জুবাইদা রহমানের স্মৃতিবিজড়িত কাজী ফজলুল হক মহিলা হোস্টেলে যান এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। আলোচনা সভায় যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী ক্যাম্পাসে চলমান দুটি ছাত্রী হলের উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত হন এবং ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে দুটি গাছের চারা রোপণ করেন।
ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী ঢামেক
অনুষ্ঠানে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ওপর একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু একটি মেডিকেল কলেজ না, এটি একটি ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে এই প্রতিষ্ঠানের অবদান অনস্বীকার্য। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবে ঢামেকের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা যেভাবে আহত ও শহীদদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।’
তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমরা এখান থেকে শুধু ভালো চিকিৎসকই তৈরি করিনি; শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা ও মুক্তিযোদ্ধাও তৈরি করেছি। ঢামেক রাজধানীর মানুষের সার্বক্ষণিক এক নির্ভরতার প্রতীক।’
চিকিৎসকদের পরম বন্ধু ও ভরসার আশ্রয়স্থল
চিকিৎসকদের মহান পেশার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মানুষ বিপদে পড়লেই চিকিৎসকদের কাছে যায় এবং তাদের ভরসার আশ্রয়স্থল মনে করে। চিকিৎসক ও রোগীকে ঘিরে আবর্তিত হয় একটি পরিবারের অগাধ বিশ্বাস।’ এ সময় তিনি তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘকালীন চিকিৎসার প্রসঙ্গ টেনে দেশের চিকিৎসকদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘বিদেশে হয়তো উন্নত টেকনিক্যাল সাপোর্ট বা ইকুইপমেন্ট পাওয়া যায়, কিন্তু এ দেশের চিকিৎসকেরা যেভাবে চব্বিশ ঘণ্টা মানবিকভাবে আমার মায়ের টেক-কেয়ার করেছেন, তা বিদেশে কোনোভাবেই পাওয়া যেত না।’
৫ হাজার নতুন চিকিৎসক নিয়োগের ঘোষণা
দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারের নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, চিকিৎসাকর্মীদের নিরাপত্তা জোরদারে উপজেলা হেলথ কমপ্লেক্সগুলোতে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং হাসপাতালগুলোতে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে আরও ৫ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণের লক্ষ্যে নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট ও মিডওয়াইফ নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। নিরাপদ মাতৃত্ব ও নবজাতকের যত্ন নিশ্চিত করতে সরকারি পর্যায়ে আরও ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের বাজেট এবার প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যা আগামী ৫ বছরে জিডিপির ৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় দীর্ঘদিন পড়ে থাকা ৫টি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল আগামী সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে চালু করা হবে।
‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ ও হেলথকেয়ারার নিয়োগ
চিকিৎসকদের ওপর রোগীর মানবিক চাপ কমাতে ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর’ নীতির ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানের প্রিভেনশন বিষয়ের উচ্চশিক্ষা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে সরকার ‘হেলথকেয়ারার’ নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এই হেলথকেয়ারাররা বেসিক ট্রেনিং নিয়ে ঘরে ঘরে গিয়ে কার্ডিয়াক, কিডনি ও ডায়াবেটিসের মতো রোগ প্রতিরোধে লাইফস্টাইল ও খাদ্যাভ্যাস নিয়ে নারীদের সচেতন করবেন, যা আগামী ১০ বছরে চিকিৎসকদের ওপর থেকে রোগীর চাপ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। বক্তব্যের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, ‘জানেন তো, ডাক্তারের স্বামী বা স্ত্রী যাই হই না কেন, আমি যেহেতু একজন ডাক্তারের স্বামী, তাই হাফ ডাক্তার হয়ে গেছি! সেই হিসেবে কিছু কথা বলার লোভ সামলাতে পারলাম না।’
হাসপাতাল পরিষ্কার রাখার আহ্বান
মেডিকেল বর্জ্যের বৈজ্ঞানিক অপসারণ ও হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘শুধু নতুন বিল্ডিং করলেই হবে না, পরিবেশ রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। জাপানি দর্শকদের গ্যালারি পরিষ্কারের উদাহরণ টেনে তিনি চিকিৎসক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারী সবাইকে নিজ উদ্যোগে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন রাখার আহ্বান জানান।
২৫ বছরের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রেষ্ঠ কেন্দ্র হবে ঢামেক
ডা. জুবাইদা রহমান বিশেষ অতিথির বক্তব্যে কার্ডিওলিস্ট ডা. জুবাইদা রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজকে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে দেখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভিত্তি জ্ঞান হলেও চিকিৎসা পেশার প্রকৃত ভিত্তি মানবিকতা। একটি আশ্বস্ত করার বাক্যও অনেক সময় ওষুধের মতো কাজ করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা যতই প্রযুক্তি নির্ভর হোক না কেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময় মানুষই থাকে।’
বক্তব্যের শুরুতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। এরপর ঢামেক হাসপাতালে তার ছাত্রজীবন ও ইন্টার্নশিপের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেন। অতীতে চিকিৎসাসামগ্রী বা যন্ত্রাংশের অভাবে রোগীর অসহায় মৃত্যুর কিছু আবেগঘন ও মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা শেয়ার করে তিনি ঢামেককে রোগীদের জন্য ‘সেন্টার অফ এক্সিলেন্স অ্যান্ড কম্প্যাশন’ হিসেবে গড়ে তোলার ওপর তাগিদ দেন। একই সাথে তিনি ঢামেকের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের শুধু স্মৃতির বন্ধনে নয়, মেধা ও দায়িত্বের বন্ধনে যুক্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে অবদান রাখার আহ্বান জানান।
মতবিনিময় সভা ও গুণীজনদের উপস্থিতি
মূল অনুষ্ঠানের আগে ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভাবনা’ শীর্ষক ২ ঘণ্টাব্যাপী একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে ঢামেকের সাবেক শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়নে তাদের বিভিন্ন চিন্তাভাবনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মুসররাত সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রতিমন্ত্রী এমএন মুহিত এবং কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাজহারুল শাহীন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়া হায়দার, স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব)-এর সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ, বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম এবং অধ্যাপক নাজমুল হাসান প্রমুখ।
- বিষয় :
- প্রধানমন্ত্রী
- ঢাকা মেডিকেল কলেজ
- ইতিহাস