আল মাহমুদের জন্মদিন
লোকজ জীবনের মহাকাব্যিক কথক
আল মাহমুদ
আশফাকুজ্জামান
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ২১:১৪
তিতাস থেকে বুড়িগঙ্গাছেলেটি চঞ্চল। মন ডানপিটে। গ্রামের পথে হাঁটে। পাখির ডাক শোনে। কাদার গন্ধ শোঁকে। এই ছেলেটির হৃদয়ে গেঁথে গেল গ্রামীণ রূপকথা। রক্তে মিশে গেল লোকজ মিথ। বাবা গান ভালোবাসেন। আবার দাদুর মুখে শুনতেন জারিগান। এভাবেই গড়ে ওঠে এক কিশোরের মনোজগৎ।
তারপর এলো ঝড়ের দিন। দেশ ভাগ হয়। শুরু হয় ভাষা আন্দোলন। চারদিকে স্লোগান। কিশোর মাহমুদ মিছিলে নামে। পুলিশ তাকে খোঁজে। সে বাড়ি ছাড়ে।
শুরু হয় এক যাযাবর জীবন। কিন্তু পকেটে কবিতা আর বুকে শব্দ। এই মানুষটিই বাংলাদেশের অনন্য কবি– আল মাহমুদ।
সময় যেতে থাকে। কবির ভাবনা ডানা মেলে। এভাবে একদিন তিনি পা রাখেন ঢাকা দক্ষিণের প্রবেশদ্বার সদরঘাটে। গা ছুঁয়ে যায় বুড়িগঙ্গার বাতাস। হাতে ভাঙা সুটকেস। পকেটে পয়সা নেই। কিন্তু চোখ ভরা স্বপ্ন।
সদরঘাটে যখন তাঁর প্রথম পায়ের দাগ পড়ে, সেই সময়টা ছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক। ১৯৫৪ সাল। ঢাকা তখন এক অচেনা নগরী। শহরটা তাঁকে ভয় দেখায়। তিনি ভয় পান না। বরং ঘুরে বেড়ান শহরের গলিপথ ধরে।
সাংবাদিকতা
অবশেষে আশ্রয় হয় পত্রিকার অফিসে। খাবারের অভাব। কিন্তু কবিতা লিখে যান নিরবধি। তখনকার ঢাকা ছিল সাহিত্যের আড্ডাখানা। বিউটি বোর্ডিংয়ের প্রাণ। তরুণ মাহমুদ সেখানে যান। চোখে চশমা। মুখে কবিতা। গ্রামীণ শব্দ দিয়ে কবিতা গাঁথেন। কবিরা চমকে ওঠেন। সম্পাদকেরা মুগ্ধ হন।
এক কবির বুকে শব্দের আগুন। হাতে এক সব্যসাচী কলম। সাপ্তাহিক ‘কাফেলা’ পত্রিকায় লেখার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর সাংবাদিক জীবন। একই সময় ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে কাজ করেন। পরে ‘কাফেলা’ পত্রিকার সম্পাদক হন। তারপর ইত্তেফাক পত্রিকার প্রুফ রিডার। কিছুদিন পর ইত্তেফাকের সহসম্পাদক। মাঝে কিছুদিন চট্টগ্রাম ‘বইঘর’ প্রকাশনীর সঙ্গে যুক্ত হন। ষাটের দশকজুড়ে তাঁর সংবাদপত্রে বিচরণ। ১৯৬৯ সালে আবার তিনি ‘ইত্তেফাক’-এর সহকারী সম্পাদক হন। জীবনের শেষ প্রান্তে ‘দৈনিক সংগ্রাম’-এর সহকারী সম্পাদক হন। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক কর্ণফুলী’ পত্রিকা সম্পাদনা করেন। এভাবে প্রুফ রিডার থেকে শুরু করে প্রধান সম্পাদকের চেয়ার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাঁর এক আপসহীন, নান্দনিক সাংবাদিক জীবন।
শিল্প-সাহিত্য
ধীরে ধীরে কবি বিশাল সাহিত্য সম্ভারে আলোকিত হন। গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, আত্মজীবনী, সাক্ষাৎকার, সাংবাদিকতাসহ নানা অনুষঙ্গে জীবনকে সমৃদ্ধ করেন। লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিনসহ ১২টিরও বেশি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। পানকৌড়ির রক্ত, সপ্তর্ষি, প্রিয় পঞ্চমীসহ তাঁর রয়েছে প্রায় ছয়টি গল্পগ্রন্থ। উপমহাদেশ, কাবিলের বোন, কবি ও কোলাহলসহ লিখেছেন প্রায় ১২টি উপন্যাস। এখানেই শেষ নয়, যেভাবে বেড়ে উঠি, বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ এবং যে পারো ভুলিয়ে দাওসহ লিখেছেন চারটি আত্মজীবনী। এ ছাড়া পাখির কাছে ফুলের কাছে, ময়নামতির নেকলেস, বাতাসের নূপুরসহ ১০টিরও বেশি শিশু-কিশোর গ্রন্থ রয়েছে তাঁর।
সাক্ষাৎকার
বাংলা সাহিত্যে সাক্ষাৎকার প্রদানে কবি আল মাহমুদ সম্ভবত রেকর্ড করেছেন। তিনি প্রায় চার দশকে অসংখ্য সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সরদার আবদুর রহমান তাঁর ৬০টি সাক্ষাৎকার নিয়ে একটি বই করেছেন। বাংলা সাহিত্যে আর কোনো কবি, সাহিত্যিক এত সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বলে জানা নেই। বিভিন্ন পত্রিকায় কলাম, প্রবন্ধ ও ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন।
কাব্যগ্রন্থ
১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’। বাংলা সাহিত্যে এ যেন এক নতুন সুর। বাংলা কবিতার বাঁকবদল। ‘লোক লোকান্তর’ নাগরিক কবিতা নয়। মাটির গান। নদী ও নারীর উপাখ্যান। কবির জীবনের বহিঃপ্রকাশ।
‘আমার চেতনা যেন এক শাদা সত্যিকার পাখি,
বসে আছে সবুজ অরণ্যে এক চন্দনের ডালে;…,
লোক থেকে লোকান্তরে আমি যেন স্তব্ধ হয়ে শুনি
আহত কবির গান। কবিতার আসন্ন বিজয়।’
কবি আল মাহমুদের কবিতায় প্রকৃতি ও মানুষের মন এক হয়ে যায়। কবির ভাবনায় চেতনা বিমূর্ত নয়। এটা এক রহস্যময় পাখি। চন্দনের ডাল, সবুজ অরণ্য, লতা আর পরাগের গন্ধ, এসব কবির আত্মার প্রতিধ্বনি। প্রকৃতির এই মায়া কবিকে মুক্তির স্বাদ দেয়। সংসার, সমাজ, ধর্ম, লোকালয়, মানুষকে আড়ষ্ট রাখে। চেতনার পাখি ডানা মেললেই উন্মুক্ত প্রকৃতি। এটা রহস্যময় এক অন্তর্জগৎ। যেখানে কেবলই সুন্দরের বাস। শত প্রতিকূলতার মাঝেও শিল্পের জয় হয়। এই কবিতা তারই ঘোষণা।
এখানে আহত কবি মানে সেই স্রষ্টা, যিনি যন্ত্রণা বহন করেন। কিন্তু তাঁর কণ্ঠেই জন্ম নেয় সৌন্দর্য। অরণ্যের নীরবতায় দাঁড়িয়ে কবি শোনেন সুন্দরের আহ্বান। তাই এই কবিতা প্রকৃতির ছবি। এটি আত্মার জাগরণ। সৌন্দর্যের বিস্ময়। কবিতার এক অপূর্ব নান্দনিক উপাখ্যান।
কালের কলস প্রকৃতির এই নিবিড় পাঠ ও অন্তর্জগতের মায়াবী সীমানা পেরিয়ে কবি দৃষ্টি ফেরান মহাকালের দিকে। ‘লোক লোকান্তর’ গ্রন্থের আত্মার জাগরণ আর কবিতার নান্দনিকতা সঙ্গী করে ১৯৬৬ সালে রচনা করেন এক অপূর্ব কাব্যগ্রন্থ ‘কালের কলস’।
অনিচ্ছায় কতকাল মেলে রাখি দৃশ্যপায়ী তৃষ্ণার লোচন
ক্লান্ত হয়ে আসে সব, নিসর্গও ঝরে যায় বহুদূর অতল আঁধারে
আর কী থাকলো তবে হে নীলিমা, হে অবগুণ্ঠন
আমার কাফন আমি চাদরের মত পরে কতদিন আন্দোলিত হবো
কতকাল কত যুগ ধরে
দেখবো, দেখার ভারে বৃষের স্কন্ধের মতো নুয়ে আসে রাত্রির আকাশ?
এক কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে কবি বাংলা কবিতার লোকজ শব্দ, গ্রামীণ মাঠ, ঘাট, পরিবেশ, প্রকৃতি ও নাগরিক জীবনের এক অনন্য সমন্বয় করেছেন। ‘কালের কলস’ সময় ও জীবনের গভীরে নামার এক কাব্যিক অভিযাত্রা। চারপাশের চেনা পৃথিবী, নিসর্গ যেন এক অতল অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। জীবনের সব কোলাহল ক্ষীণ হয়ে আসছে। এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা যেন সময়ের চিরন্তন সংগ্রাম, স্বপ্ন, আত্মপরিচয়ের নিরন্তর অনুসন্ধান। কবি তাঁর ভাবনা উচ্চারণ করেন, শিল্পে রূপ দেন। তারপর শব্দের ভেতর জ্বেলে দেন অনুভূতির দীপশিখা। এখানেই এই কাব্যগ্রন্থের শিল্পসৌন্দর্য, গভীরতা এবং দীর্ঘস্থায়ী আবেদন।
সোনালী কাবিন, কালের কলস গ্রন্থের পর এবার কবির অভিযাত্রা যেন বৃহত্তর কোনো পূর্ণতার দিকে। এই অন্বেষণই তাঁকে বাংলার শিকড় ও মাটির কাছে নিয়ে যায়। এর চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে তাঁর ‘সোনালী কাবিন’ কাব্যগ্রন্থে।
তখন ১৯৭৩ সাল। প্রকাশ হলো তাঁর মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘সোনালী কাবিন’। এটি বাংলা সাহিত্যের এক চিরন্তন সম্পদ। তিনি লোকজ ভাষাকে করেন সর্বজনীন। কামনার আগুনকে শিল্পের রূপ দেন। তিনি লেখেন–
আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন,
পরম স্বস্তির মন্ত্রে গেয়ে ওঠো শ্রেণির উচ্ছেদ,…
তারপর তুলতে চাও কামের প্রসঙ্গ যদি নারী
ক্ষেতের আড়ালে এসে নগ্ন করো যৌবন জরদ,…।
আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’ বাংলা সাহিত্যের এক চিরন্তনী কাব্য। এখানে ইতিহাস ও মাটির গন্ধ আছে। তিনি গ্রামীণ প্রেমকে এক ঐশ্বরিক রূপ দিয়েছেন। এখানে কবি নগরের কৃত্রিমতা ভেঙে শিকড়ের টানে ফিরেছেন। অপূর্ব শব্দমালায় গেঁথেছেন কাম ও প্রেম। এই কবিতা এক শাশ্বত মিলনের ঘোষণা। এই মিলন শহুরে ঐশ্বর্য বা যৌতুকের বিনিময় নয়। কবির কাবিন হলো প্রকৃতির দান।
তিনি নদী, পলিমাটি আর শস্যের বিনিময়ে নারীকে আপন করতে চান। কবির কাছে প্রেম কোনো বিলাসিতা নয়। বেঁচে থাকার সংগ্রাম। গ্রামীণ বধূর আঁচলে লুকিয়ে থাকে বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি। সামন্তবাদী শোষণের বিরুদ্ধে কবি দ্রোহী। ‘সোনালী কাবিন’ প্রেমের কবিতা নয়, এটি মাটির বুকে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিচ্ছবি।
গল্প
কবি আল মাহমুদ বাংলা কবিতার প্রাণ। আবার সেই তিনিই এক মায়াবী কথাসাহিত্যিক। তখন ১৯৭৫ সাল। চারদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই লেখেন ছোটগল্পের বই ‘পানকৌড়ির রক্ত’। এ বইয়ের প্রথম গল্পটির নামও ‘পানকৌড়ির রক্ত’।
বাংলা সাহিত্যে আক্তারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’, শাহেদ আলীর ‘জিব্রাইলের ডানা’, আলাউদ্দিন আল আজাদের ‘বৃষ্টি’সহ কিছু কালজয়ী গল্প আছে। তেমনি কবি আল মাহমুদের ‘পানকৌড়ির রক্ত’ও এক কালজয়ী গল্প। এটি বাংলা সাহিত্যের এক অনন্য সম্পদ।
কবি সদ্য বিবাহিত। তাঁর মনে এক অন্য ঝড়। কুমারী নারীর প্রতি আদিম তৃষ্ণা। অথচ নিয়তির পরিহাস! স্ত্রী আদিনার শরীরে তখন ঋতুচক্রের রক্তধারা। মিলনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা বিফল।
এই কামনার আগুনে পুড়ছেন কবি। তিনি গ্রামের বিলের দিকে তাকান। সেখানে এক পানকৌড়ি। ডুব দেয় গভীর অতলে। ঠিক যেমন কবি ডুব দিতে চান তাঁর আদিনার সিন্ধ শরীরের ভাঁজে। পানকৌড়ির ভেজা পালক যেন আদিনার দীর্ঘ কেশ। পাখিটার গ্রীবা, বুকের ওঠানামা ভেতরকে জাগিয়ে দেয়। তাঁর চোখে প্রকৃতি ও নারী একাকার। পানকৌড়ি হয়ে ওঠে কামার্ত এক মানবী। হঠাৎ বন্দুকের গুলি। ছিন্নভিন্ন হয় পানকৌড়ির চঞ্চলতা। লাল রক্ত ছিটকে পড়ে স্বচ্ছ জলে।
কবির চোখে সেই রক্ত আর সাধারণ কোনো তরল নয়। এ যেন আদিনার গোপন অবয়ব থেকে পড়া অবাধ্য ধারা। পানকৌড়ির সেই রক্ত আর আদিনার নিভৃত রক্তস্রোত মিশে যায় এক মোহনায়। পানকৌড়ির চঞ্চু আর আদিনার ঠোঁট এক হয়ে যায়। এর পিঠের কালো মখমল যেন আদিনারই অন্ধকার উপত্যকা। রক্তমাখা সেই ডানা যেন আদিনারই কুমারিত্বের বিসর্জন। রক্তাক্ত ডানার স্পন্দন যেন আদিনারই সত্তার প্রতিধ্বনি।
এই গল্পটিতে গ্রামীণ যৌন আবেগ, সেই আবেগের দ্রোহ, আর অবদমন মিলে তৈরি হয়েছে এক অনন্য আখ্যান। বাংলা সাহিত্য স্তব্ধ হয়ে দেখে এক খাঁটি, কাঁচা ও নান্দনিক আবেগের দ্রোহ।
উপন্যাস
কবি ভোরের কুয়াশা, মাটির গন্ধ, প্রেম, আবেগ ও আবেগের দ্রোহ থেকে ফিরে আসেন জীবনের বাস্তবতায়। তিনি একাত্তরের যুদ্ধদিনের এক দুঃসহ পরিস্থিতি নিয়ে লেখেন উপমহাদেশ উপন্যাস। যেখানে আছে ঘাত-প্রতিঘাত, যুদ্ধ, মৃত্যু ও জীবনের অনিশ্চয়তা।
এই উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে হামিদ মীর নামে এক কবি। দেশপ্রেম ও মৃত্যুর ভয়ে ঝুলছে তার অস্তিত্ব। তার সঙ্গে যুক্ত হয় দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা আনিস। আছে নন্দিনী। যুদ্ধের বিভীষিকা, বোন সীমার মৃত্যু ও চরম নিরাপত্তাহীনতা নন্দিনীকে পুরোপুরি কবি হামিদ মীরের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। উত্তাল যুদ্ধদিনের দীর্ঘ যাত্রায় তাদের মানসিক নৈকট্য এক গভীর ভালোবাসায় রূপ নেয়। আল মাহমুদ এই সম্পর্কের মিলনান্তক রূপ দেননি। বরং যুদ্ধকালীন সংকটে মানুষের হৃদয়ের দোটানা, নৈতিক বোধ ও সম্পর্কের বহুমাত্রিক রূপকে উন্মোচন করেছেন।
উপন্যাসটিতে রয়েছে রাজেনৈতিক জটিলতা। রণাঙ্গনের মাঠেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বিভিন্ন পন্থিদের আদর্শিক ফাটল। দেশ স্বাধীনের চেয়েও তাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে রাজনীতির সমীকরণ। দেশ যখন হানাদারের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত, কেউ কেউ তখন ব্যস্ত তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে।
আল মাহমুদ এই উপন্যাসে স্বপ্ন ও ভাঙনের গল্প বুনেছেন। যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও জেগে থাকে প্রেম। এটি শেষ পর্যন্ত মানুষের বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা ও ভালোবাসার গান। এটি এক মানবাত্মার উপাখ্যান।
উপমহাদেশ উপন্যাসের মতো কাবিলের বোনও যুদ্ধদিনের উপন্যাস। তবে এটি যুদ্ধদিনের এক মনস্তাত্বিক প্রেমের উপন্যাস। ঢাকা তখন আগ্নেয়গিরি। চারদিকে উত্তেজনা, ভয়, আতঙ্ক। এই উত্তাল সময়ের এক অনন্য দলিল ‘কাবিলের বোন’ উপন্যাস। এটি শুধু যুদ্ধের কাহিনি নয়। এটি এক চরম মনস্তাত্ত্বিক উপাখ্যান। আল মাহমুদ এখানে ফুটিয়ে তুলেছেন অবরুদ্ধ শহরের ভেতরের জীবন যন্ত্রণা।
উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে কাবিল। সে এক মানবিক ও পরোপকারী বাঙালি যুবক। তার পাশে ছায়ার মতো জড়িয়ে আছে পিতৃহীন মামাতো বোন মোমেনা। অন্যদিকে রয়েছে উচ্চবিত্ত ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন তরুণী রোকসানা। রোকসানার ফুফাতো ভাই আন্দালিব এক অবাঙালি যুবক। এই চার চরিত্র ঘিরে আবর্তিত হয় কাহিনির বিন্যাস।
যুদ্ধ তাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। কাবিল ও আন্দালিবের ভেতরে চলে আদর্শের লড়াই। একজন বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক, অন্যজন পাকিস্তানি ভাবধারার। রোকসানা এই দুইয়ের টানাপোড়েনের সেতু। তাদের সম্পর্কগুলো রক্তের নয়। কিন্তু একাত্তরের তীব্র অনিশ্চয়তা তাদের এক সুতোয় বেঁধেছে।
শহরের বুকে তখন পাকিস্তানি জান্তার বুটের আওয়াজ। প্রতিদিন মানুষ মরছে। সম্পর্কগুলো প্রতিনিয়ত রূপ বদলাচ্ছে। এই ভয়াবহতার মাঝেও আল মাহমুদ বুনেছেন এক গভীর মায়াজাল। উপন্যাসের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে গভীর দহন। তিনি ইতিহাসের এক অমোঘ সত্য তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন যে যুদ্ধ শুধু মানুষ মারে না, মানুষের ভূগোলও বদলে দেয়। এই ভূগোল যেমন মানচিত্রের, তেমনি তা হৃদয়েরও। একাত্তরের সেই অবরুদ্ধ মনস্তত্ত্ব বাংলা সাহিত্যে তিনি নিখুঁতভাবে এঁকেছেন।
আল মাহমুদ ছোট-বড় সব পাঠকের কথা ভেবেছেন। শব্দকে তিনি এমন এক সহজ জাদুতে রূপ দিতেন, যা সবার মন ছুঁয়ে যায়। বয়সের সীমানা পেরিয়ে তিনি অনন্য। তাঁর লেখার আবেদন সর্বজনীন। তিনি বাংলা সাহিত্যের এমন সাহিত্যিক, যাঁর লেখা ছোট-বড় সবাইকে আলো দেয়। পাখির কাছে ফুলের কাছে, ময়নামতির নেকলেস, বাতাসের নূপুরসহ ১০টিরও বেশি শিশুসাহিত্য রয়েছে তাঁর। ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ তাঁর এক অমর সৃষ্টি। শিশুরা তাঁর ছড়ায় খুঁজে পায় নদী, ফুল-পাখি, প্রজাপতি। তিনি চাঁদের আলো দিয়ে শব্দ বোনেন। শিশু-কিশোরদের জন্য ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’ কবিতায় লিখেছেন–
নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল
ডাবের মত চাঁদ উঠেছে ঠাণ্ডা ও গোলগাল।
ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে গেলাম ঘর
ঝিমধরা এই মস্ত শহর কাঁপছিলো থরথর…।
কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই
পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই।
রাতের নিঝুম আকাশ। চাঁদ উঠেছে নারকেল গাছের ডগায়। কবি একা। চেনা শহর যেন এক মায়াবী রূপকথার জগৎ। শহরটি কাঁপছিল থরথর। মিনারের ছায়া যেন এক প্রহরী। দরগাতলায় মোড় নিতেই হাতছানি দেয় পাহাড়। ডাকে– ‘আয়, আয়!’ পাহাড় ছুঁয়ে কবি জোনাকিদের আলো ঝলমলে রাজদরবারে যায়। আবার দিঘির জল তাঁকে বলে এসো আজ কাব্য করি। কবি পকেট থেকে ছড়ার বই নিয়ে প্রকৃতির মায়াজালে ফুল, পাখির কাছে মনের কথা বলেন।
বিতর্ক ও নির্জনতা জীবন তো সোজা চলে না। আল মাহমুদের জীবনও বাঁক নিল। শেষ বয়সে তিনি বদলে গেলেন। তাঁর ভাবনায় এলো আধ্যাত্মিকতা। সমাজ তাঁকে নিয়ে দুই ভাগে ভাগ হলো। বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়ল না। কিন্তু তিনি ছিলেন অবিচল। তিনি শুধু লিখে গেছেন। তাঁর চোখ দুটি অন্ধ হয়ে আসছিল। কিন্তু ভেতরের চোখ ছিল খোলা। তিনি মুখে বলতেন। ভক্তরা তা লিখে রাখত। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করলেন– ‘কোনো এক ভোরে দেখবে তোমরা আমি আর নেই।’
জন্ম
সে অনেক দিন আগের কথা। দিনটি ছিল ১১ জুলাই। ১৯৩৬ সাল। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রাম। চারদিকে তখন বর্ষার জল। নদীর নাম তিতাস। সেই নদীর কোল ঘেঁষেই জন্ম নিল এক শিশু। নাম তার মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। ডাকনাম শুধুই মাহমুদ।
মৃত্যু
‘স্মৃতির মেঘলা ভোর’ শিরোনামে কবির এক অনন্য কবিতা আছে। যেখানে তিনি শুক্রবার ভোরে মৃত্যুর প্রার্থনা করেছেন। চিরবিদায়ের আকাঙ্ক্ষায় শব্দ বুনেছেন এক গভীর আত্মসমর্পণের সৌন্দর্যে।
কোনো এক ভোরবেলা, রাত্রি শেষে শুভ শুক্রবারে
মৃত্যুর ফেরেশতা এসে যদি দেয় যাওয়ার তাকিদ
অপ্রস্তুত এলোমেলো এ গৃহের আলো অন্ধকারে
ভালোমন্দ যা ঘটুক মেনে নেবো এ আমার ঈদ।
তখন ২০১৯ সাল। ১৫ ফেব্রুয়ারি। শীতের অবসান। চারদিকে বসন্ত। ঢাকার এক হাসপাতালে চোখ বুজলেন কবি আল মাহমুদ। বয়স তখন ৮২ বছর। দুলে উঠল মায়াবী পর্দা। কবি চলে গেলেন ওপারে। কিন্তু প্রকৃতির কী এক অমোঘ খেলা! কবি শুক্রবারে মৃত্যু কামনা করেছিলেন। আর যেদিন তাঁর মৃত্যু হলো সেই দিনটি ছিল শুক্রবার। এটা হয়তো কোনো অলৌকিক কিছু নয়। কিন্তু এর নান্দনিকতা অস্বীকারের উপায় নেই। মহৎ কবিদের জীবনদর্শন এমনই হয়।
কবি আল মাহমুদ আজ নেই। আছে তাঁর তিতাসের জল। সোনালী কাবিনের শ্লোক। বাংলা ভাষা যতদিন থাকবে, আল মাহমুদ থাকবেন ততদিন। তিনি মাটি মানুষ ও প্রকৃতির কবি। মায়াবী কথক।