ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট প্রতিরোধযুদ্ধ না করলে দেশ এখনো পাকিস্তান থাকত: স্পিকার
আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২৬ | ২০:৫৭ | আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৬ | ২১:০০
জাতীয় সংসদের স্পিকার ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট যদি ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু না করতো, তাহলে এ দেশ এখনো পাকিস্তান থাকত।
আজ শনিবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীর রাওয়া হেলমেট হলে ‘দি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট–ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এমন মন্তব্য করেন। রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (রাওয়া) আয়োজিত এ সভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানসহ রাওয়া চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল হকের সভাপতিত্বে সাবেক সেনা কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘স্বাধীনতার কথা রাজনীতিবিদরা চিন্তাও করেনি। ১৯৭০ সালে ভোট হয়েছে ছয় দফার উপরে। তখনকার আন্দোলনটির নাম ছিল সাম্যের আন্দোলন। দুটি অঞ্চলের মধ্যে সমতা ছিল না। এ জন্য পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ ক্ষুব্ধ ছিল।’
স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়ে বীর বিক্রম খেতাব পাওয়া হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘স্বাধীনতা কখনোই উচ্চারিত হয়নি। এমনকি ২৫ মার্চ যখন পাকিস্তান আর্মির ক্র্যাকডাউনের পূর্বে প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন, শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়ে বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা আক্রমণ করতে যাচ্ছে, দেশের মানুষ স্বাধীনতা চায়। এখনো সময় আছে, আপনি স্বাধীনতা ঘোষণা করুন। শেখ মুজিবুর রহমান সাহেব বললেন, না। আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারি না, পাকিস্তান ভাঙতে আমার কোনো অবদান থাকুক, এটি আমি চাই না। সুতরাং স্বাধীনতার ঘোষণা আমি দিবো না। স্বাধীনতার ঘোষণা তিনি দেননি।’
মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ভূমিকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পাকবাহিনী নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে। এমন সময়ে জনগণের পক্ষে দেশের মানুষের জীবন রক্ষার জন্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। এ সময় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন মেজর জিয়াউর রহমান। এটি হলো প্রকৃত সত্য। যে ঘোষণায় জাতি অনুপ্রাণিত হয়েছে।’
যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। কিন্তু এই কথা ইতিহাসে নাই বলে উল্লেখ করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
রাজনীতিবিদদের সমালোচনা করে স্পিকার বলেন, ‘রাজনীতিবিদরা সাধারণত অন্যের কৃতিত্ব হাইজ্যাক করেন এবং কাউকে কৃতিত্ব দিতে চান না, নিজেরা এবং নিজের দলের নেতাকে ছাড়া। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো- ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল জনতার যুদ্ধ, একটি জাতির যুদ্ধ।’
আলোচনায় তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের গৌরবময় ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র পাঁচটি ব্যাটালিয়ন ছিল। পাঁচটি ক্যান্টনমেন্টে আলাদা আলাদারভাবে কেউ কারোর সঙ্গে যোগাযোগ না রেখে বিদ্রোহ করেছে পাকিস্তানি গণহত্যার প্রতিবাদে। তারা জনগণকে সংগঠিত করেছে, মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন, জনগণকে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য আহ্বান করেছেন।
এসময় সেনাবাহিনীতে যোগদানের স্মৃতিচারণ করেন হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
আলোচনা সভায় মুক্তিযুদ্ধে ১৯৭১ সালে যাদের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, তাদের অকপটে তা স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি বলেন, ‘৭১–এ যাদের বিতর্কিত ভূমিকা ছিল, যারা ‘৭১–এ মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, তাদের এগিয়ে আসতে হবে। জাতির কাছে তাদের এই বিষয়টাকে অকপট স্বীকার করে, ক্ষমা চাইতে হবে।’
জাতীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ টেনে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী বলেন, সবাই ঐক্য চান। তবে মুক্তিযুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়া সহজ নয়। তাই, এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরই উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সবার অবদানে বাংলাদেশ আগামী দিনে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাক—এই প্রত্যাশাও করেন মন্ত্রী।
আলোচনা সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারানো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি তুলেন রাওয়া সদস্যরা। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রণালয় খেতাবপ্রাপ্ত ও সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মাননা দিয়ে থাকে। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ দেওয়া বা বিশেষ অবদান রাখা সদস্যদের কোনো ধরনের খেতাব বা সম্মাননা দেওয়া যায় কি না, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করবে।
ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার আহ্বান জানান মন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ সামরিক পদক ‘ফিল্ড মার্শাল’ চালু করে জেনারেল এম এ জি ওসমানীকে মরণোত্তর এই পদক দেওয়ার দাবি করেন সাবেক এক সেনা কর্মকর্তা। পাশাপাশি দেশের সেনাবাহিনীর আগে দেশপ্রেমের যেই ঐতিহ্য ছিল সেখান থেকে দূরে সরে গিয়েছে। এর পেছনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতাকে দায়ী করেন সাবেক সেনা কর্মকর্তারা।
- বিষয় :
- জাতীয় সংসদ
- স্পিকার