ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

চলে গেলেন বন্যপ্রাণীপ্রেমী সিতেশ রঞ্জন দেব

চলে গেলেন বন্যপ্রাণীপ্রেমী সিতেশ রঞ্জন দেব
×

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সিতেশ রঞ্জন দেব সংগৃহীত

শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

সিতেশ রঞ্জন দেব, যিনি মানুষের কাছে ‘সিতেশ বাবু’ নামেই পরিচিত। ফোন পেলেই ছুটে যেতেন এই মানুষটি, উদ্ধার করতেন বন্যপ্রাণী। 
কোথাও আহত বানর, বিদ্যুতের তারে ঝুলে থাকা পাখি, লোকালয়ে ঢুকে পড়া অজগর, এসিডে ঝলসে যাওয়া শকুন কিংবা পাচারকারীর কবল থেকে উদ্ধার বন্যপ্রাণী পরম যত্নে সুস্থ করে বনে অবমুক্ত করতেন তিনি।

আর কারও ফোনে সাড়া দেবেন না এই মানুষটি। উদ্ধার করবেন না কোনো বন্যপ্রাণী। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন সবার পরিচিত ‘সিতেশ বাবু’।  তাঁর বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তিনি ছিলেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকালে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালে নেওয়ার পথে পরলোক গমন করেন সিতেশ রঞ্জন দেব। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মঙ্গলবার দুপুরে শ্রীমঙ্গল উপজেলার নোয়াগ্রামে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে।

সিতেশ রঞ্জন দেবের জীবন যেন একটি অসাধারণ রূপান্তরের গল্প। ছোটবেলায় বাবা শিরীষ রঞ্জন দেবের সঙ্গে শিকারে যেতেন। তখন দেশে বন্যপ্রাণী শিকারে কঠোর বিধিনিষেধও ছিল না। ১৯৮৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর তিনিও কিছু দিন শিকার করেন। কিন্তু খুব দ্রুতই তাঁর উপলব্ধি হয়, প্রকৃত বীরত্ব প্রাণ নেওয়ায় নয়, প্রাণ বাঁচানোর মধ্যেই। সেই উপলব্ধিই বদলে দেয় তাঁর জীবন।
মানুষের হাতে নির্যাতিত, বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে আহত, এসিডে ঝলসে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনায় জখম কিংবা পাচারকারীর কবল থেকে উদ্ধার হওয়া অসংখ্য বন্যপ্রাণীর শেষ ঠিকানা ছিল শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। নিজ বাড়ির ছোট্ট একটি প্রাণীসেবাকেন্দ্র থেকে শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। পরে রূপসপুর বাগানবাড়িতে স্থানান্তরিত হয়ে সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। গত কয়েক দশকে তাঁর হাত ধরে চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেয়ে হাজারো বন্যপ্রাণী সুস্থ হয়ে ফিরে গেছে প্রকৃতির কোলে।
দেশের যেকোনো প্রান্তে লোকালয়ে বন্যপ্রাণী ঢুকলেই বনবিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিভিন্ন উদ্ধারকারী সংগঠন কিংবা সাধারণ মানুষের প্রথম ভরসা ছিলেন সিতেশ বাবু। বন্যপ্রাণী উদ্ধারে তাঁর নিরলস পরিশ্রম, দক্ষতা ও মানবিকতা তাঁকে দেশের সবচেয়ে বিশ্বস্ত প্রাণীসেবকদের একজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। শুধু প্রাণী উদ্ধার নয়, বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং জনসচেতনতা তৈরিতেও তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান।

শারীরিক অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর দুই ছেলে সজল দেব ও সঞ্জিত দেব বাবার দেখানো পথেই বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সেবার দায়িত্ব পালন করে আসছেন। মৃত্যুর আগেই তিনি নিশ্চিত করে গেছেন, এই মানবিক দায়িত্ব যেন থেমে না যায়।
সিতেশ বাবুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে শ্রীমঙ্গলে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ শ্রীমঙ্গল শাখার সভাপতি ডা. হরিপদ রায় বলেন, সিতেশ বাবুর মতো মানুষ যুগে যুগে জন্ম নেন না। তিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন নির্বাক প্রাণীদের জন্য। তাঁর চলে যাওয়া শুধু শ্রীমঙ্গলের নয়, পুরো দেশের অপূরণীয় ক্ষতি।
শ্রীমঙ্গল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা জহর তরফদার ও একরামুল কবির জানান, যে মানুষটির স্নেহ-ভালোবাসায় প্রতিদিন মুখর থাকত অসংখ্য উদ্ধার হওয়া পশু-পাখি, সেই অভিভাবককে হারিয়ে যেন তারাও নিস্তেজ। 
সিতেশ রঞ্জন দেবের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের এমপি মুজিবুর রহমান চৌধুরীসহ বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা।
 

আরও পড়ুন

×