ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

বালু তোলায় বাঁধ ভেঙে ৩৫ গ্রাম প্লাবিত

বালু তোলায় বাঁধ ভেঙে ৩৫ গ্রাম প্লাবিত
×

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩১

| প্রিন্ট সংস্করণ

ড্রেজার দিয়ে বালু তোলার কারণে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে গেছে। এতে প্লাবিত হয়েছে তিন ইউনিয়নের প্রায় ৩৫টি গ্রাম। জমির ফসল, মাছের ঘের ডুবে প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ড্রেজার দিয়ে মাটি কাটার কারণে বাঁধ ভাঙার ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। বালু উত্তোলনে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড। গত সোমবার রাতে শায়েস্তাগঞ্জ থানায় মামলাটি করেন হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপসহকারী প্রকৌশলী সামিউল আজম। আসামি করা হয়েছে মেসার্স শামীম বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী ইকবাল হোসেন ও শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার সুদিয়াখলা গ্রামের মামুনুর রশিদকে।

মামলার বিবরণে বলা হয়, গত ১১ জুলাই থেকে শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলার আলাপুর আশ্রয়ণ প্রকল্প-সংলগ্ন খোয়াই নদী থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করে আসছিল। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শামীম বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী ইকবাল হোসেন আলাপুর মৌজার জেএল নং- ১৫৬, খতিয়ান নং-১, দাগ নং-আর এস-৮৯০ সীমানার মধ্যে ব্যক্তিমালিকানার জমির মাটি কাটার বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ হন। কিন্তু চুক্তিনামার বাইরে আরএস ৫৭৫ ও ৪০১ নম্বর দাগের খাসখতিয়ানভুক্ত জমি থেকে মাটি তোলেন আসামিরা। এ ছাড়া স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল কাইয়ুমের জমি থেকেও অনুমতি ছাড়াই মাটি কেটে নেন, যা চুক্তিনামার ৬ নম্বর শর্তের লঙ্ঘন। চুক্তি অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মাটি কাটার কথা। কিন্তু শর্তভঙ্গ করে রাতে মাটি কেটে নেন, যা ১৬ নম্বর শর্তের লঙ্ঘন। ৮ নম্বর শর্ত অনুযায়ী বালু উত্তোলনকালে নদীর তীর ও তৎসংলগ্ন ফসলি জমি বা গ্রামের পরিবেশের কোনোরূপ ক্ষতি করা যাবে না। কিন্তু বাঁধ ছিদ্র করে ড্রেজারের পাইপ প্রবেশ করানো হয়েছে, যার ফলে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে এবং ড্রেজিংয়ের সময় নদীর স্লোপ সংরক্ষণ করা হয়নি। যার ফলে গত ৯ জুলাই খোয়াই নদীর লস্করপুর ইউনিয়নের কালীগঞ্জ বাঁধ ভেঙে প্রায় ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। এরই মধ্যে অভিযান চালিয়ে বালু উত্তোলনের সরঞ্জাম জব্দ করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

স্থানীয় বাসিন্দা রহমত মিয়া বলেন, নদী থেকে অবাধে বালু তোলার কারণেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রভাবশালীরা বালু তোলেন, আর ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ কৃষক। মনির মিয়া জানান, বন্যার পানিতে তাঁর মাছের ঘেরসহ ফসলি জমির প্রায় ১০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এখন এই দায় কে নেবে? আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।’ কৃষক মহরম আলী বলেন, ‘আমার দুই বিঘা জমির শসা সব নষ্ট হয়ে গেছে বন্যার পানিতে। এখন আমি কীভাবে সংসার চালামু বুঝতে পারছি না।’
শায়েস্তাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম জানান, সোমবার মামলা হয়েছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
হবিগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরীফুল আলমের ভাষ্য, জেলার এক হাজার ৪৫৩টি পুকুর ও ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ৩০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে এর পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ক্ষতিগ্রস্তের তালিকা ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাকসুদুল আলম জানান, বন্যায় আউশ ধান, শাকসবজি এবং ফলের বাগানসহ নানা পণ্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এখনও চলছে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ। তবে এরই মধ্যে যতটুকু জানা গেছে কৃষি খাতে অন্তত ২০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে। যার পরিমাণ আরও বাড়বে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে। দ্রুত তা সম্পন্ন করা হবে এবং মামলার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

আরও পড়ুন

×