ছোটমণি নিবাসে বেড়ে উঠছে সেই ‘অলৌকিক’ শিশু
শিশু ফাতেমা
তানভীর হোসাইন, ময়মনসিংহ
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ | ১২:২৫
আজ থেকে ঠিক চার বছর আগের এক দুপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশালে এক ভয়ংকর সড়ক দুর্ঘটনায় ‘অলৌকিকভাবে’ জন্ম নিয়েছিল শিশু ফাতেমা। ঘাতক ট্রাকের চাপায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ফাতেমার অন্তঃসত্ত্বা মা রত্না বেগম ও বাবা জাহাঙ্গীর আলম। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যায় তার বড় বোন সানজিদা (৩)। মায়ের পেট ফেটে পিচঢালা তপ্ত সড়কে ছিটকে পড়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া সেই সদ্যোজাত শিশুটি আজ চার বছর পূর্ণ করল।
ফুটফুটে ফাতেমার এখন নিরাপদ আশ্রয় ঢাকার আজিমপুরের ছোটমণি নিবাস। চার বছর ধরে এখানেই বড় হচ্ছে এতিম শিশুটি; মুখে ফুটেছে বুলি। তবে সে বোঝে না– দুর্ঘটনা বা মৃত্যু কী। ফাতেমার বৃদ্ধ দাদা শারীরিক প্রতিবন্ধী মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল জানান, ফাতেমা জানে না মা-বাবার আদর কী! নেই কোনো স্মৃতি। তবে সে তার মা-বাবার খোঁজ করে অবুঝ গলায় প্রশ্ন করে, ‘আমি অ্যাক্সিডেন্ট হইয়া বাচ্চা হইছি; আব্বা-আম্মা কই?’
এত ছোট বয়সে মা-বাবার মৃত্যুর আঘাত সইতে পারবে না শিশুটি। তাই পরিবার তাকে এখনও কঠিন সত্যটি জানায়নি। ছোটমণি নিবাসের নিয়ম অনুযায়ী বয়স ৬ বছর পূর্ণ হলে ফাতেমাকে বাড়িতে নিয়ে নিজের কাছেই বড় করবেন বলে প্রহর গুনছেন তার দাদা।
ফাতেমার বাবা জাহাঙ্গীর আলম ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম। কাজ করতেন দিনমজুরের। জাহাঙ্গীরের আকস্মিক মৃত্যুতে তাঁর পরিবারে আছেন বৃদ্ধ বাবা-মা এবং দুই সন্তান অষ্টম শ্রেণিতে পড়ুয়া জান্নাত (১৩) ও তৃতীয় শ্রেণির এবাদত (১০)। শারীরিক প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ দাদার একটি ছোট্ট দোকানের সামান্য আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়িয়েছেন প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা।
লন্ডন থেকে সে সময় ফাতেমা ও তার পরিবারের আজীবন ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর নির্দেশে সাবেক ছাত্রনেতা নাইমুল করিম লুইনের মাধ্যমে প্রতি মাসে ফাতেমার ত্রিশালের বাড়িতে চাল-ডাল-তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পরিবারটির জন্য একটি পাকা বাড়ির নির্মাণ কাজও চলমান। এ ছাড়া শিশু ফাতেমার ‘অলৌকিক’ জন্মকে স্মরণীয় রাখতে তাদের বাড়ির সামনের সড়কটির নাম রাখা হয়েছে ‘ফাতেমা রোড’।
ফাতেমার দাদার বয়স ৬৫ বছর। তাঁর দুই ছেলেই মারা গেছেন। তিন মেয়ে বিবাহিত। তাদের কারও আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। তবে ফাতেমার ফুপুরা নিয়মিত তার খোঁজখবর রাখেন। ঈদুল আজহার পরদিন ২৯ মে সর্বশেষ ফাতেমাকে ঢাকায় দেখতে গিয়েছিলেন তার দাদা-দাদি। ফাতেমা এ সময় জানতে চায়– তার বাবা-মা কেমন আছেন।
ঢাকার আজিমপুরের ছোটমণি নিবাসের উপতত্ত্বাবধায়ক তানজিনা আফরিনের সঙ্গে গতকাল বুধবার কথা বলেছে সমকাল। তিনি জানান, জন্মের কয়েক দিন পর থেকেই ফাতেমা তাদের এখানে আছে। দেখতে দেখতে তার বয়স চার বছর হয়ে গেল। অন্য সব স্বাভাবিক শিশুর মতোই তার বেড়ে ওঠা। অন্য শিশুদের মতোই তার পড়ালেখা, খেলাধুলা ও খাবারদাবারের কোনো কমতি নেই। নিয়মিত শিক্ষক এবং ধর্মীয় শিক্ষকের মাধ্যমে ফাতেমার পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাকি শিশুদের মতোই হেসে-খেলে বড় হচ্ছে। সরকারি সাধ্য অনুযায়ী ও তার চাহিদামতো সবকিছুর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তানজিনা আফরিন আরও জানান, ছোটমণি নিবাসে বর্তমানে ছয় বছরের কম বয়সী ৩৭ জন ছেলেমেয়ে আছে। সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফাতেমার ৬ বছর পূর্ণ হলে তাকে সরকারি শিশু পরিবার বালিকায় স্থানান্তর করা হবে। সে ক্ষেত্রে তার পরিবার যদি তাকে নেওয়ার জন্য আবেদন জানায়, সেটি সরকার বিবেচনা করবে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নানা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান সমকালকে জানান, সম্প্রতি ফাতেমার দাদার দোকানে ১০ হাজার টাকার মালপত্র, বাড়ি নির্মাণের জন্য টিন এবং বড় দুই ভাইবোনের স্কুলের বেতন মওকুফের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পরিবারটির ভরণপোষণের সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
আজ ফাতেমার জন্মের চার বছর পূর্ণ হওয়ার দিনে ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার রায়মণি গ্রামের বাড়িতে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। ফাতেমার দাদা জানান, পাড়া-প্রতিবেশী ও নাতি-নাতনিদের নিয়ে একটু খিচুড়ি রান্না করে দোয়া পড়ানো হবে। এর মাধ্যমে প্রয়াত ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতনির আত্মার মাগফেরাত প্রার্থনা করবেন তারা।