সেবায় বদলে যাওয়া হাসপাতাল
স্বাস্থ্যসেবায় প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সম্প্রতি তোলা সমকাল
এস এম কাওসার, বগুড়া
প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৩ | আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ১১:২৯
| প্রিন্ট সংস্করণ
জরায়ুর টিউমার নিয়ে যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলেন আমেনা খাতুন নামে এক গৃহবধূ। তাঁর বাড়ি বগুড়ার শেরপুর উপজেলার গাড়িদহ গ্রামে। চিকিৎসকরা তাঁকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে টিউমারটি অপসারণের পরামর্শ দিয়েছিলেন। একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে যোগাযোগও করেন। সেখানে অস্ত্রোপচারের জন্য অন্তত ৪০ হাজার টাকা লাগবে বলে জানানো হয়। আমেনার স্বামী সামান্য মুদি দোকানি। এত টাকা কীভাবে জোগাড় করবেন, ভেবে কূলকিনারা পাচ্ছিলেন না। শেষমেশ আসেন উপজেলা সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে বিনামূল্যে অস্ত্রোপচার করা হয়। পাশাপাশি চিকিৎসক ও নার্সদের আন্তরিকতায় তাঁর মুখে হাসি ফুটে ওঠে।
সম্প্রতি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির নারী ওয়ার্ডে আমেনা খাতুনের সঙ্গে কথা হয়। ৪৭ বছরের এই গৃহবধূ বলেন, টিউমারের যন্ত্রণায় তিনি অতিষ্ঠ ছিলেন। দুশ্চিন্তায় ঠিকমতো নাওয়া-খাওয়া করতে পারছিলেন না। অস্ত্রোপচার নিয়ে তাঁর ভয় ছিল। তার ওপর প্রাইভেট ক্লিনিকের খরচ জোগানো ছিল দুরূহ। কিন্তু এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসার পর চিকিৎসক, নার্সসহ সবার ভালো আচরণে তিনি মুগ্ধ। খরচও খুব কম। কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। সব মিলিয়ে বড়জোর পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। টিউমার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। তাতেই অনেক খুশি।
আমেনা খাতুনের অস্ত্রোপচার করেন গাইনি সার্জন ডা. অনুসোয়া রায়। তিনি বলেন, ‘আমেনা খাতুনের মতো অনেক রোগীই আসেন, তাদের অপারেশন করি। তারা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যান। তাদের সুস্থ করে তোলা আমাদের দায়িত্ব। আমরা সেটা নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করি। রোগীদের মুখে যখন হাসি ফুটে ওঠে, তখন আমার খুব ভালো লাগে।’
ঝকঝকে চত্বর, ছাদে ফুলের সুবাস
এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ছাদে সারি সারি টবে গোলাপের গাছ। টকটকে লাল গোলাপ ফুটেছে। হাওয়া-বাতাসে সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। রোগী ও তাদের স্বজনরা এখানে সময় কাটানোর সুযোগ পান।
পুরো হাসপাতাল চত্বর যেন ছোট্ট একটি ফুলের বাগান। কিছু ফলের গাছও আছে। আছে ছোট ছোট সবজি ক্ষেত। আছে ঔষধি গাছে। পুরো চত্বর ঝকঝকে। একসময় যেখানে সন্ধ্যার পরই ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করত। বর্তমানে সেই উপজেলা কমপ্লেক্সজুড়ে আলো ঝলমল করে।
জানা গেছে, ২০১৮ সালে ১৩ কোটি ৮৮ লাখ ৪৪ হাজার টাকা ব্যয়ে অত্যাধুনিক চারতলার আউট পেশেন্ট ডিপার্টমেন্ট (ওপিডি) ও চিকিৎসকদের আবাসিক ভবনসহ আরও চারটি ভবন নির্মাণ করা হয়। অত্যাধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন চালু করা ছাড়াও প্যাথলজির সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম, যক্ষ্মা রোগীদের জিন এক্সপার্ট পরীক্ষা, ইসিজি, এএনসি এবং পিএনসি সেবা, সুসজ্জিত ডেন্টাল সার্ভিস, কৈশোরবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা, টেলিমেডিসিন চিকিৎসাসেবা, হারবাল চিকিৎসাসেবা, ডায়াবেটিস ও ব্লাড প্রেশার রোগীদের জন্য এনসিডি কর্নার, শিশুদের জন্য আইএমসিআই কর্নার, কেএমসি কর্নারসহ রোগীদের জন্য অন্যান্য সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা চালু রয়েছে। আছে নিরাপদ গ্যারেজ।
কোলে নবজাতক, হাতে উপহার নিয়ে বাড়ি ফেরেন প্রসূতিরা
অবকাঠামোগত সুবিধা থাকলেও সরকারি এই প্রতিষ্ঠানে আগে নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা ছিল কম। ২০২৪ সালের আগে দিনে দু-একটির বেশি হতো না। এখন প্রতিদিন নরমাল ডেলিভারি হয় অন্তত পাঁচ-সাতটি। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রতিদিন গড়ে একটি শিশুর জন্ম হয়। বিনামূল্যে সন্তান প্রসবের জন্য শুধু শেরপুর উপজেলা নয়, আশপাশের কয়েকটি উপজেলার অনেক প্রসূতি এখানে আসেন। ফুটফুটে নবজাতক কোলে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের হাতে তুলে দেন নানা উপহার। এতে প্রসূতিদের মুখে আরেক দফা আনন্দময় হাসি ছড়িয়ে পড়ে।
ধুনট উপজেলার ভাণ্ডারবাড়ি এলাকার গৃহবধূ মোমেনা বেগম বলেন, ‘আমার প্রসব ব্যথা উঠলে আমার স্বামী আমাকে নিয়ে সোজা এখানে আসেন। চিকিৎসক দেখে বললেন, নরমাল ডেলিভারি হবে, চিন্তার কোনো কারণ নেই। তাই হলো। আমার একটা মেয়ে হয়েছে।’
মোমেনা বেগম আরও বলেন, এর আগে একটি প্রাইভেট ক্লিনিকে গিয়েছিলেন। সেখানে অস্ত্রোপচারের জন্য ৩০ হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এখানে এক টাকাও লাগেনি। ডাক্তার, নার্স ও অন্য কর্মীদের সবার আচার-ব্যবহার অত্যন্ত ভালো। সরকারি হাসপাতালে এত ভালো ব্যবস্থা আছে, তিনি কল্পনাই করতে পারেননি।
ভালো ব্যবহারে রোগ অর্ধেক সেরে যায়
শেরপুর কলোনি এলাকার ময়েন উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি ভর্তি হয়েছেন শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে। তিনি বলেন, ‘এখানে আসার পর নার্স ও ডাক্তারদের ব্যবহারে আমি অনেকটা সুস্থ হয়ে গেছি। আমি অনেক দিন ধরে ভুগছি। অনেক হাসপাতালে গেছি। কিন্তু এ ধরনের আচরণ অন্য কোনো হাসপাতালে পাইনি। ডাক্তারদের ভালো ব্যবহারে রোগ অর্ধেক সেরে যায়। এখানে খাবারের মানও ভালো।’
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষ জানায়, ভর্তি রোগীদের প্রতিদিন সকালে ডিম, পাউরুটি ও কলা দেওয়া হয়। দুপুরে ও রাতে কোনো দিন মাছ, ডাল ও সবজি এবং কোনো দিন ডাল ও সবজির পাশাপাশি মাংস থাকে। বিভিন্ন জাতীয় দিবসে মাংস-পোলাও দেওয়া হয়। রোগী ও তাদের স্বজনদের খাবারের জন্য আছে ডাইনিংয়ের ব্যবস্থা। খাবারের মান বজায় রাখা হয়।
আছে জলাতঙ্কের প্রতিষেধকও
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, জেলার বেশির ভাগ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জলাতঙ্কের কোনো প্রতিষেধক নেই। শেরপুর উপজেলাসহ আশপাশের ধুনট, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ ও তাড়াশ, নন্দীগ্রাম, শাজাহানপুর এই ছয় উপজেলার মানুষ একসময় দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বগুড়া শহীদ জিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিতেন। তাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য ২০২১ সাল থেকে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জলাতঙ্কের পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা হয়। এখানে এখন প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন জলাতঙ্কের প্রতিষেধক নিতে আসেন। শিশু বিভাগ আলাদা না থাকলেও শিশুদের চিকিৎসার কোনো কমতি নেই।
রোগীর সন্তুষ্টিতে জোর
এ হাসপাতালের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. আমিরুল ইসলাম প্রতিদিন ২৫-৩০ জন রোগী দেখেন। পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজও চালিয়ে যান। এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে সাফল্যের উচ্চ শিখরে নিয়ে যান ডা. সাজিদ হাসান সিদ্দিকী লিংকন। তিনি বর্তমানে শিবগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনার দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে ডা. মিরুল ইসলাম বলেন, ‘ডা. সাজিদ লিংকন আমার পথপ্রদর্শক, তাঁর প্রচেষ্টায় এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি আচার-ব্যবহারসহ নানা দিক থেকে দুইবার দেশের সেরা হয়েছে। আমরা তাঁকে অনুসরণ করে সাফল্য ধরে রাখতে চেষ্টা করছি। রোগীদের সাথে একটু ভালো ব্যবহার করলে, মনোযোগ ও গুরুত্ব দিয়ে রোগীর কথা শুনলে, রোগী ও তাদের স্বজনরা খুব খুশি হন। তারা অনেকটা স্বস্তি বোধ করেন। আমরা রোগীদের সন্তুষ্টিকে প্রাধান্য দিই।’
মে মাসে সেবাগ্রহণকারীর পরিসংখ্যান
শিশু জন্মগ্রহণ করেছে ৬৩০টি, জলাতঙ্কের ভ্যাকসিন নিয়েছেন ৩৮৭ জন, প্যাথলজি সেবা নিয়েছেন দুই হাজার ১০৭ জন, মোবাইল ফোনে স্বাস্থ্যসেবা নিয়েছেন ১৪৯ জন, বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ১৭ হাজার ৬৭৮ জন, জরুরি বিভাগে সেবা নিয়েছেন তিন হাজার ৭৪৭ জন, অন্তঃবিভাগের সেবা নিয়েছেন ৯৯৮ জন, কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিয়েছেন ১৮ হাজার ৯৪ জন, শিশুদের ইপিআই টিকা দেওয়া হয়েছে ৬৩৫ জনকে।
একসময় এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দৈনিক গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগী স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করতেন। এখন প্রায় এক হাজার রোগী সেবা গ্রহণ করেন। রোগী ভর্তির সংখ্যা শতাধিক।
প্রতি শনিবার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিশেষ চিকিৎসাসেবা দেন ডা. তাওহিদ মাহমুদ। তিনি বলেন, গড়ে ৮০-৯০ প্রতিবন্ধী রোগী আসেন।
যে সাত ক্যাটেগরিতে পরপর দুইবার দেশের সেরা
এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা রোগীদের আন্তরিকভাবে স্বাগত জানান অভ্যর্থনা ডেস্কের কর্মীরা। তারা রোগীর প্রাথমিক সমস্যার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। এর পর কাউকে বহির্বিভাগে, কাউকে জরুরি বিভাগে পাঠান। জরুরি বিভাগ থেকে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শে রোগীকে ভর্তি করা হয়। ভর্তি রোগীকে দেওয়া হয় একটি পরিপাটি শয্যা। শুরু হয় চিকিৎসাসেবা। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বড়জোর ২০ মিনিট সময় লাগে। প্রতিটি ধাপে কর্মী ও চিকিৎসকদের আন্তরিকতায় রোগীরা খুশি হন। বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা পেয়ে তারা হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যান।
সাতটি ক্যাটেগরিতে পরপর দুবার দেশের সেরা হয়েছে বগুড়ার শেরপুর উপজেলা সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ক্যাটেগরিগুলো হলো– রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে ভালো আচরণ, রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান; পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, ছাদবাগান ও পুরো চত্বরে বাগান এবং মনোরম পরিবেশ; প্যাথলজিক্যাল সেবা বৃদ্ধি, নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা বৃদ্ধি, অস্ত্রোপচার সেবা বৃদ্ধি এবং খাবারের মান উন্নত করা ও ডাইনিংয়ের ব্যবস্থা করা। এ সব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে সারাদেশের ৪৯২টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে দুবার প্রথম স্থান অর্জন করল প্রতিষ্ঠানটি।
লোকবল সংকটেও আসে সাফল্য
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, ৫০ শয্যার এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে লোকবল সংকট প্রকট। ৩৯ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে আছেন ২২ জন, তৃতীয় শ্রেণির ১১৮টি পদের মধ্যে আছেন ৮৬ জন, চতুর্থ শ্রেণির ২৪টি পদের মধ্যে আছেন মাত্র পাঁচজন। এই লোকবল সংকটের মধ্যেও সেবার মান ধরে রাখতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সবাই। এ কারণেই সাফল্য আসে।
বগুড়া সিভিল সার্জন ডা. খুরশীদ আলম জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের র্যাঙ্কিংয়ে ২০২৫ সালে সারাদেশের ৪৯২টি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মধ্যে সর্বোচ্চ ৮৯ দশমিক ৪৪ রেটিং পয়েন্ট নিয়ে প্রথম স্থান অর্জন করেছে শেরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ২০২৪ সালেও দেশসেরা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি।
- বিষয় :
- হাসপাতাল