মেঘালয়ের মেঘ মানেই ডাউকিপারের কান্না
ভারী বর্ষণ আর মেঘালয়ের ঢল নামলেই সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার এই ডাউকি নদী উছলে ভাসে দুকূল। বুধবার তোলা ছবি সমকাল
জাকির হোসেন, গোয়াইনঘাট (সিলেট)
প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
ছবির মতো অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা সিলেটের সর্ব উত্তরের উপজেলা গোয়াইনঘাট। এই সুন্দরের মাঝে রয়েছে অনিশ্চিত জীবনের আতঙ্ক। প্রায় প্রতিবছরই আকস্মিক ভারী বৃষ্টি ও ভারতের মেঘালয় থেকে আসা পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ভেসে যায় এই জনপদ। এ জন্য বর্ষা মৌসুমের শুরু থেকেই আতঙ্কে থাকেন এই উপজেলাবাসী।
গত কয়েক বছরের প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও ক্ষয়ক্ষতির তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, গোয়াইনঘাট উপজেলা হয়েই ঢলের পানি আঘাত হানে সিলেটের মূল অংশে। এই অঞ্চলের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢল।
পিয়াইন নদীর উৎসমুখ ভরাট হয়ে যাওয়া ও ডাউকি নদীর তীর সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিবছরের পাহাড়ি ঢলে নদীতে বিলীন হচ্ছে রাস্তাঘাট, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি।
সীমান্ত জনপদ সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা দুটি নদী হচ্ছে পিয়াইন ও ডাউকি। এ নদী দুটির উৎপত্তি হচ্ছে মেঘালয়ের বুক চিরে বয়ে আসা ভারতের উমগট নদী থেকে।
নদীটি জাফলংয়ের জিরো পয়েন্ট এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে একটির নাম ধারণ করেছে পিয়াইন এবং অপরটি ডাউকি নামে। পিয়াইন নদীর উৎসমুখ ভরাটের তিন যুগ হলেও আজ পর্যন্ত এই নদীটি খননের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। যার ফলে পাহাড়ি ঢলের সব পানি জাফলং জিরো পয়েন্ট এলাকা দিয়ে এসে ডাউকি নদী দিয়ে চলে যায়। এই নদীটির
তীর সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে ডাউকি নদীর দুই কূল ছাপিয়ে ভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাট।
স্থানীয় তথ্য মতে, গত তিন যুগে এই ডাউকি নদীর তীরবর্তী এলাকার ছয় থেকে সাতটি গ্রামের অন্তত আড়াইশ বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বিলীন হয়েছে ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট। পাহাড়ি ঢলের কারণে ভাঙনের এ ধারা অব্যাহত রয়েছে ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে। যে কারণে স্থানীয় এলাকার লোকজন বলে থাকেন মেঘালয়ের মেঘ মানেই ডাউকি পারের কান্না।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৮ সালের ভয়াল বন্যা ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তৎকালীন সংগ্রাম বিডিআর ক্যাম্পসহ বেশ কিছু এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। একই সঙ্গে স্রোতের তোড়ে পলি আর বালুমাটি এসে পিয়াইনের উৎসমুখ থেকে পাদুয়া হয়ে ঢালারপাড় পর্যন্ত চার কিলোমিটার নদীপথ ভরাট হয়ে যায়। ফলে পানির গতিপথ পরিবর্তন হয়ে এক সময়ের ছোট খাল রূপ নিয়েছে বিশাল নদীতে। যা বর্তমানে ডাউকি (জাফলং) নদী নামে পরিচিত।
গোয়াইনঘাট উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার খায়রুল ইসলাম ও সাবেক ইউপি সদস্য ভুক্তভোগী মহর আলী মেম্বারসহ এলাকার বয়োবৃদ্ধরা জানান, উৎপত্তি হওয়ার পর থেকে যথাযথভাবে নদীর তীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রতিবছরই নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে মানুষের বসতবাড়ি।
পরিসংখ্যান মতে, ১৯৮৮ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে গোয়াইনঘাট উপজেলার অবিভক্ত পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের মমিনপুর গ্রামের প্রায় ২৭টি, ছৈলাখেল অষ্টমখণ্ড গ্রামের ১৯টি, আসামপাড়া গ্রামের ৩৩টি, নয়াগাঙের পাড় গ্রামের ৪৯টি, বাউরবাগ গ্রামের ১৩টি, বাউরবাগ হাওর গ্রামের ৪২টি ও বাউরবাগ হাওরের নদীর পূর্ব পারের প্রায় ৬৯টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।
ইউএনও রতন কুমার অধিকারী বলেন, বন্যা আর পাহাড়ি ঢলে ভাঙনের কবল থেকে উপজেলার রাস্তাঘাট, বসতবাড়ি এবং ফসলি জমি রক্ষায় ডাউকি নদীর উৎসমুখ থেকে বাংলাবাজার পর্যন্ত নদীর তীর সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সম্প্রতি তিনি এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা এ ব্যাপারে উদ্যোগও নিয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গৃহীত প্রকল্পের সঙ্গে ইউএনও ঝুঁকিপূর্ণ নতুন কিছু এলাকা সংযুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। নদীর তীর সংরক্ষণ কাজের প্রকল্পটি খুব শিগগিরই আলোর মুখ দেখবে বলে ইউএনও রতন কুমার অধিকারী জানিয়েছেন।
- বিষয় :
- নদী