ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ফিরে দেখা জুলাই

সাগরহারা পরিবারে চাপা কান্না

সাগরহারা পরিবারে চাপা কান্না
×

ছবি: সমকাল ইপেপার

সোহেল মিয়া, বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী)

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৪১ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১২:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

‘প্রতিটি সময়, প্রতিটি মুহূর্তই বেদনার ও কষ্টের। তবে জুলাই এলেই বুকের মধ্যে চাপা ক্ষোভ আর কষ্টে ভরে যায়। জুলাই মানেই বেদনার মাস। জুলাই এলেই আমার আর ভালো লাগে না। এই জুলাই মাসেই আমি হারাই আমার বুকের মানিক, আমার কলিজার টুকরো সন্তানকে।’ কোটা সংস্কারের দাবিতে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া আন্দোলনে সন্তান হারানো সাগর আহমেদের (২১) মা গোলাপী বেগমের কথাগুলো বুকে বিঁধে যায়। ওই বছরের ১৯ জুলাই ঢাকার মিরপুর গোলচত্বরে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সাগর।

২০ জুলাই রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নারুয়া ইউনিয়নের টাকাপোড়া গ্রামে জানাজা শেষে বিল টাকাপোড়া কবরস্থানে তাঁর দাফন হয়। এ ঘটনায় হওয়া মামলার গতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাগরের স্বজনেরা। গত শুক্রবার টাকাপোড়া গ্রামে গিয়ে তাদের আফসোসের কথাগুলো জানা যায়। এই গ্রামের তোফাজ্জেল হোসেন-গোলাপী বেগম দম্পতির দুই ছেলে-মেয়ের মধ্যে বড় ছিলেন সাগর। 

আফসোসের সুরে গোলাপী বেগম বললেন, ‘আজ দুইটা বছর হয়ে গেল আমার কোল খালি। মানুষ বলে, সময় নাকি সব ভুলিয়ে দেয়, কিন্তু আমার কাছে মনে হয়–এই তো সেদিনের কথা।’ প্রতিটা সেকেন্ডে প্রতিটা নিঃশ্বাসে তিনি অনুভব করে চলছেন বুকের মানিক সাগরকে। ছেলে সাগর যে ছিলেন তাঁর কলিজার টুকরা!

এই মায়ের আকুতি, দেশের মানুষ যেন সাগরকে মনে রাখেন, তাঁর স্মৃতি যেন চিরকাল বেঁচে থাকে। অন্তত নারুয়া লিয়াকত আলী স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ এবং উপজেলা মডেল মসজিদের নামে ছেলের নাম যুক্ত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এতে অন্তত তিনি ভেবে সান্ত্বনা পাবেন যে, মানুষ প্রতিদিন তাঁর ছেলের জন্য দোয়া করছেন। 
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নারুয়া লিয়াকত আলী স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে ২০১৯ সালে এসএসসি পাস করেন সাগর। ২০২১ সালে রাজবাড়ী সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) শ্রেণিতে ভর্তি হন। মৃত্যুর সময় তিনি দ্বিতীয় বর্ষে পড়তেন।

এমন একজন ছেলে হারানোর যে কী কষ্ট, তা কেবল যেই বাবা হারিয়েছেন তিনিই জানেন। এমন মন্তব্য করেন সাগরের বাবা কৃষক তোফাজ্জেল হোসেন। দুই বছর ধরে বুকে পাথর নিয়ে বেঁচে থাকা এই বাবা বলেন, ‘সাগরের স্মৃতিগুলো আমাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়ায়।’ তবে দেশের জন্য, ন্যায়ের জন্য জীবন দিয়ে সাগরের যে ত্যাগ, তা যেন হারিয়ে না যায়–সেই আকুতিও জানান।

তোফাজ্জেল হোসেনের ভাষ্য, তাঁকে ফসলের মাঠে কাজ করতে দেখে সাগর প্রায়ই বলতেন, ‘বাবা, আর কটা দিন অপেক্ষা করো। তোমাকে আমি আর রোদে পুড়তে দেবো না।’ এমনকি একমাত্র ছোট বোন নুস্মীকে নিয়েও অনেক স্বপ্ন ছিল সাগরের। এইচএসসি পাসের পর ঢাকায় নিয়ে তাকে কোচিংয়ে ভর্তি করবে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে–এমন কথাও ছিল সাগরের মুখে। দুজন পড়াশোনা শেষে সংসারের হাল ধরার কথাও বলত। গত বছর নারুয়া লিয়াকত আলী স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেছে নুস্মী। বলতে বলতে গলা ধরে আসে তোফাজ্জেল হোসেনের। তিনি বলেন, আজ সব শেষ। সাগর নেই। মেয়েটা রাজবাড়ী সরকারি কলেজে অনার্স পড়ছে। ঢাকায় থাকা হলো না তাদের।

মামলার গতি নিয়ে প্রশ্ন
সাগর হত্যার ঘটনায় ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুর মডেল থানায় মামলা (নং-১৫) করেন তাঁর চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম। এতে আসামি করা হয় ৪৮৬ জনকে। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন–তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্য ওবায়দুল কাদের, জুনায়েদ আহমেদ পলক, মো. এ আরাফাত, আনিসুল হক, পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি হারুন অর রশিদ।

মামলাটি বর্তমানে সিআইডিতে আছে বলে জানান বাদী সাইফুল ইসলাম। তিনি মামলার অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘সাগরের মৃত্যুর দুইটা বছর পার হয়ে গেল। ভেবেছিলাম, এই মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে রায় কার্যকর হবে।’ তাঁর দাবি, বিচারপ্রক্রিয়া যেন ঝুলিয়ে রাখা না হয়, দ্রুত যেন শেষ করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়। 

এই মামলা তদন্ত করছেন সিআইডির পরিদর্শক কৃষ্ণ দাস। তাঁর ভাষ্য, অল্প সময় হলো মামলাটি থানা থেকে সিআইডিতে এসেছে। এখানে অনেক আসামি। তাদের অনেকেরই পূর্ণাঙ্গ ঠিকানা নেই। আসামির নাম আছে, বাবার নাম নেই, কারও আবার ঠিকানাও নেই। সেগুলোর সংগ্রহের কাজ চলছে। ইতোমধ্যে মামলার বাদীর কাছে এ বিষয়ে সহায়তা চেয়েছেন। সাক্ষীদেরও উপস্থিত করতে বলা হয়েছে। তিনি আন্তরিকতার সঙ্গে গুরুত্ব দিয়েই মামলার তদন্ত করছেন বলেও জানান। 

আরও পড়ুন

×