ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

ময়মনসিংহ-১১

অনিয়ম-অপতৎপরতার ঘটনায় বিএনপির এমপিকে শোকজ

৪৮ ঘণ্টার মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে

অনিয়ম-অপতৎপরতার ঘটনায় বিএনপির এমপিকে শোকজ
×

ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু

 নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫০ | আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ১০:৪৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

চাঁদাবাজির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দুই বছর আগে ময়মনসিংহের ভালুকার নেতা ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে দল থেকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। কিন্তু পরে আবার দলে যুক্ত হয়ে ময়মনসিংহ-১১ (ভালুকা) আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এবার তাঁর বিরুদ্ধে শিল্পাঞ্চলে আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। এ কারণে দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য তাঁকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে বিএনপি। 

গতকাল শনিবার বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সই করা শোকজ নোটিশটি দেওয়া হয়। বাচ্চুকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এর জবাব দিতে হবে।
শোকজ নোটিশে এমপি বাচ্চু ও তাঁর ঘনিষ্ঠ লোকজনের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ করে শিল্প এলাকায় নানা ধরনের অনৈতিক অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। বাচ্চু বর্তমানে ভালুকা উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক।

ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে হামলা, মামলা ও গুলিবর্ষণ
স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাচ্চু নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ভালুকার শিল্পাঞ্চলে ঝুট ব্যবসা ও মিল-ফ্যাক্টরির নিয়ন্ত্রণ নেওয়াকে কেন্দ্র করে 

অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। ঝুট ব্যবসার একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখতে তাঁর অনুসারীরা হামলা, পাল্টা-হামলা ও প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের মতো সহিংস ঘটনা ঘটান। এতে সাধারণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয় এবং আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

সর্বশেষ হবিরবাড়ী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি বৃহৎ কারখানার ঝুট বের করতে বাধা দেওয়ার ঘটনায় উত্তেজনা চলছে। অভিযোগ উঠেছে, বাচ্চু নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর অনুসারীরা বিএনপির বিদ্রোহী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া মুহাম্মদ মোর্শেদ আলমের পক্ষের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঝুট ব্যবসা নিজেদের দখলে নেন। 

প্রতিপক্ষ নেতাদের দমনে মামলা
মোর্শেদ আলম প্রায় ২২ বছর ধরে জামিরদিয়ায় অবস্থিত এসকিউ গ্রুপের কালার মাস্টার কারখানাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ঝুট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন।

নেতাকর্মীরা জানান, চলতি বছরের ১৬ মার্চ মোর্শেদ আলমের এইচআরকেএম এন্টারপ্রাইজ ওই মিল থেকে ঝুটের মালপত্র বের করতে গেলে এমপির অনুসারী খোকা মিয়ার নেতৃত্বে ৫০-৬০ জনের একটি সশস্ত্র দল হামলা চালায়। এর পর মোর্শেদ আলম ও তাঁর অনুসারী নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেই দুটি মামলা করা হয়। 

গত ১৬ মার্চ ইব্রাহিম খলিল বাদী হয়ে মোর্শেদ আলমসহ ৫০ জন বিএনপি নেতাকর্মীকে আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় প্রথম মামলাটি করেন। এক মাস পর গত ১৬ এপ্রিল খোকা মিয়া বাদী হয়ে মোর্শেদ আলম ও তাঁর ছেলে রানাসহ ৩৭ জনকে আসামি করে ভালুকা মডেল থানায় দ্বিতীয় মামলা করেন।

এনভয় টেক্সটাইলসের ট্রাক ছিনতাই
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত গ্রিন ফ্যাক্টরি এনভয় টেক্সটাইলস লিমিটেডের একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ থেকে জানা গেছে, গত ৯ জুলাই দুপুর দেড়টার দিকে জামিরদিয়ায় অবস্থিত এনভয় টেক্সটাইলসের প্রধান ফটকের সামনে থেকে কারখানার কেমিক্যালের ব্যবহৃত খালি ড্রাম বহনকারী একটি ট্রাক একদল দুর্বৃত্ত ছিনিয়ে নিয়ে যায়। পরে এনভয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা ও শিল্প পুলিশের জরুরি সহায়তায় ওই দিন রাত ৯টার দিকে ট্রাকটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

গত ১১ জুলাই ময়মনসিংহ শিল্প পুলিশ সুপার বরাবর এনভয় টেক্সটাইলসের ডিজিএম মো. সারোয়ার হোসেন লিখিত অভিযোগ দেন। এতে বলা হয়, ট্রাক ছিনতাইয়ের ওই ঘটনার সঙ্গে ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খলিল এবং ১০ নম্বর হবিরবাড়ি ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. সোহাগ মিয়াসহ তাদের বেশ কয়েকজন সহযোগী সরাসরি জড়িত ছিলেন। শুধু তাই নয়, ইব্রাহিম খলিল ও সোহাগ মিয়া ফ্যাক্টরি থেকে ওয়েস্টেজ বা ঝুট মালপত্র বের না করার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানের নতুন নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালু, খোয়া, স্টোন চিপসহ অন্যান্য সামগ্রী বহনকারী গাড়ি কারখানায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। এর ফলে এনভয় টেক্সটাইলসের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গেছে। 

৫ আগস্টের পরও বহিষ্কার হয়েছিলেন বাচ্চু
বিএনপির পাঠানো এই শোকজ নোটিশে অতীতে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদসহ দলের সব পর্যায়ের পদ থেকে তাঁকে ২০২৪ সালের গত ১ সেপ্টেম্বর প্রথমবার বহিষ্কার করা হয়েছিল। সে সময় ‘ভালুকা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের প্যাডে ‘এলজি বাটারফ্লাই ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি’র যাবতীয় কাজের ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার জন্য বাচ্চুর একটি বিতর্কিত সুপারিশপত্র নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় হয়। কাজ না পেয়ে কারখানায় হামলা করা হয়। এ কারণে পাঁচ দিন উৎপাদন বন্ধ ছিল। পরদিন ২ সেপ্টেম্বর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বাদী হয়ে বাচ্চুসহ ১৫-২০ জনের বিরুদ্ধে ভালুকা মডেল থানায় মামলা করেন।

দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এমপি বাচ্চু সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে তাঁকে দল থেকে চূড়ান্ত বহিষ্কারসহ কঠোর আইনি ও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কমকর্তা সমকালকে জানিয়েছেন, ৫ আগস্টের পর থানায় বাচ্চুর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ তিনটি মামলা হয়েছে। 
ভালুকা উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক (বহিষ্কৃত) মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের পর থেকে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর নির্দেশে তাঁর লোকজন আমার ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দিয়ে আসছে। তাঁর নির্দেশে দুটি মিথ্যা মামলায় আমাকে আসামি করা হয়েছে। আমার নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হচ্ছে।’ 
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু সমকালকে বলেন, কারখানা দখলের যে ভিডিও কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে, তা মূলত আওয়ামী লীগের মিছিলের বিপরীতে তাঁর লোকজনের করা একটি মিছিলের। তিনি বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য এবং থানা বিএনপির কোনো বড় নেতা ঝুট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত নন।

বিএনপি নেতা মোর্শেদ আলম ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে এমপি বাচ্চু দাবি করেন, ওই মামলাগুলোতে তাঁর কোনো ইন্ধন নেই। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত রেষারেষি।

এনভয় টেক্সটাইলসের ট্রাক ছিনতাই প্রসঙ্গে এমপি বাচ্চু জানান, ঘটনার সময় তিনি সংসদে ছিলেন। খবর পেয়ে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় ১ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাকটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন। এটি মূলত কাভার্ড ভ্যানের দুই মালিক পক্ষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ছিল। চব্বিশের ৫ আগস্ট -পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল, তা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

শোকজ নোটিশের বিষয়ে এমপি বাচ্চু বলেন, বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে এ বিষয়ে প্রতিবেদন তাঁর নজরে এসেছে। এ বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। 

বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স সমকালকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছেন। দলের ভেতরে বা বাইরে যাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠবে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×