ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘর

৬০ জন গ্রাহকের কষ্টের টাকা আত্মসাৎ

৬০ জন গ্রাহকের কষ্টের টাকা আত্মসাৎ
×

রাজবাড়ী প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৮:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নের বাসিন্দা আইয়ুব সরদার পেশায় শ্রমিক। দিনে তিন থেকে চারশ টাকা রোজগার করেন। ছয় সদস্যের সংসার চালিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কিছু টাকা জমান। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে শ্রম ঘামে কষ্টোপার্জিত সঞ্চয় দুই লাখ টাকা গত ১২ মে জমা রেখেছিলেন রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে। দুই মাস পর যখন জানতে পারেন সে টাকা জমা পড়েনি, তখন তাঁর মাথায় যেন বাজ পড়ে। 

আইয়ুব সরদারের মতো এমন অন্তত ৬০ জন গ্রাহক রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে টাকা জমা দিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। তারা সবাই টাকা জমা দিয়েছিলেন লেটার রাইটার শিহাব মৃধার কাছে। শিহাব গ্রাহকদের প্রায় কোটি টাকা আত্মসাৎ করে এখন পলাতক। তিনি রাজবাড়ী সদর উপজেলার মুলঘর ইউনিয়নের রশোড়া বাঘিয়া গ্রামের আয়ুব আলী মৃধার ছেলে।
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘর সূত্র জানায়, ডাকঘরের পোস্টমাস্টার বিকাশ চন্দ্র বদলি হয়ে যাওয়ার পর গত ৬ জুলাই এ পদে শামীম আহমেদ যোগ দেন। তাঁর কাছে একজন গ্রাহক জমা স্লিপ নিয়ে আসলে প্রথম বিষয়টি নজরে আসে। গত ১৩ জুলাই থেকে পলাতক রয়েছেন ঘটনার মূল হোতা লেটার রাইটার শিহাব মৃধা। 

গতকাল সোমবার বেলা ১২টার দিকে রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরে গিয়ে দেখা যায়, প্রতারণার শিকার গ্রাহকরা ভিড় করেছেন সেখানে। তারা সবাই তাদের টাকা লেটার রাইটার শিহাবের কাছে জমা দেন। বিনিময়ে একটি স্লিপ হাতে ধরিয়ে দেন। জমা বই পড়ে নিতে বলেন। কিন্তু জমা বই আর তাদের দেননি। কয়েক দিন আগে তারা জানতে পারেন শিহাব পলাতক। 
ডাকঘরের বারান্দায় এক বছরের সন্তান কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুমাইয়া আক্তার। রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ইউনিয়নের উড়াকান্দা গ্রামের বাসিন্দা খোকন শেখের স্ত্রী তিনি। জানালেন, স্বামী খোকন শেখ ছোটখাটো একটি চাকরি করে দীর্ঘদিন ধরে দুই লাখ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন। সেই টাকা গত এপ্রিল মাসে তাঁর নামে জমা করেন ডাকঘরে। লেটার রাইটার শিহাবের কাছে টাকা জমা দিয়েছিলেন। 
সুমাইয়ার স্বামী খোকন শেখ জানান, তিন বছর মেয়াদি হিসাবের জন্য তাঁর স্ত্রীর নামে টাকা জমা রেখেছিলেন। এরপর বেশ কয়েকবার জমা বই নেওয়ার জন্য এসেছিলেন। কখনও সার্ভারে সমস্যা, কখনও অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে পরে আসতে বলা হয়। তিন দিন আগে জানতে পারেন তাদের টাকা জমা হয়নি। যার কাছে টাকা জমা দিয়েছিলেন সেও পলাতক। 

সদর উপজেলার জাকির হোসেন জানান, তাঁর বোন লতিফুন্নেছার নামে দুই লাখ টাকা রেখেছিলেন। আরেক ভুক্তভোগী আফজাল হোসেন জানান, তারা ডাকঘরের ওপর আস্থা রেখে টাকা জমা দিয়েছিলেন। এখন জানছেন তাদের নামে কোনো হিসাবই নেই। রাজবাড়ী রেলগেট এলাকায় চা দোকানি প্রণব কুমার জানান, তিনি এক লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। তাঁর টাকাও জমা হয়নি। রাজবাড়ী নতুনবাজার এলাকার বাসিন্দা নাসরিন আক্তার জানান, তিনি দুই লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন। এখন শোনেন টাকা জমা হয়নি। 

গ্রাহকদের টাকা আত্মসাতের ঘটনায় গত ১৬ জুলাই খুলনা দক্ষিণাঞ্চলের পোস্টমাস্টার জেনারেল (চলতি দায়িত্ব) কবির আহমেদ স্বাক্ষরিত এক পত্রে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ঘটনার তদন্তে আসা কমিটির অন্যতম সদস্য কুষ্টিয়া ডাকঘরের পরিদর্শক (প্রশাসন) মো. শহিদুল ইসলাম জানান, যারা লিখতে পড়তে পারে না, তারা সাধারণত লেটার রাইটারের সহযোগিতা নিয়ে থাকেন। কিন্তু টাকা লেনদেন বা টাকা গ্রহণের এখতিয়ার তাঁর নেই। ঘটনাটি যখন ঘটে তখন পোস্টমাস্টারের দায়িত্বে যিনি ছিলেন, তিনি কিছুতেই এ দায় এড়াতে পারেন না। তাদের কাছে থাকা তথ্যানুযায়ী, ৫০ থেকে ৬০ জন গ্রাহকের টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। টাকার পরিমাণ ৮০ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে ২০ লাখ টাকার মতো ফেরত পাওয়া গেছে। তারা তদন্তের পাশাপাশি সমস্ত টাকা রিকভারি করে ভুক্তভোগী গ্রাহকদের ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। 
রাজবাড়ী প্রধান ডাকঘরের পোস্টমাস্টার শামীম আহমেদ জানান, তিনি গত ৬ জুলাই রাজবাড়ীতে যোগ দেন। ১৩ জুলাই থেকে শিহাব অফিসে আসছেন না। তাঁর মোবাইল ফোনও বন্ধ। এ বিষয়ে তারা রাজবাড়ী সদর থানায় জিডি করতে গেলে থানা থেকে তাদের আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

আরও পড়ুন

×