পদ্মার মূল প্রবাহে বড় পরিবর্তন তীর সংরক্ষণ চ্যালেঞ্জের মুখে
লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া এলাকায় নির্মাণাধীন তীর সংরক্ষণ কাঠামোর একটি অংশে সম্প্রতি ধস দেখা দেয় সমকাল
লৌহজং (মুন্সীগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
মুন্সীগঞ্জের লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলায় পদ্মা নদীর বামতীর সংরক্ষণ প্রকল্পের ৯০ শতাংশের বেশি কাজ শেষ হলেও পদ্মার রূপগত (মরফোলজিক্যাল) পরিবর্তনে প্রকল্পটি নতুন কারিগরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। নদীর মূল প্রবাহ বামতীরের দিকে সরে আসায় বিদ্যমান প্রতিরক্ষা কাঠামোর ওপর চাপ বেড়েছে। এরই মধ্যে লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া এলাকায় নির্মাণাধীন তীর সংরক্ষণ কাঠামোর একটি অংশে ধস দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
পাউবো সূত্র জানায়, ২০২১ সালে অনুমোদিত প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪৪৬ কোটি ১১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। মেয়াদ ছিল ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। পরে নদীর গতিপথ ও তলদেশে পরিবর্তনের কারণে দ্বিতীয়বার সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে ৫২৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং মেয়াদ ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। প্রকল্পের আওতায় ৯ দশমিক ১০ কিলোমিটার স্থায়ী তীর সংরক্ষণ, ৬ দশমিক ৩৬ কিলোমিটার সতর্কতামূলক প্রতিরক্ষা এবং ৫ দশমিক ৯০ কিলোমিটার শক্তিশালীকরণ কাজ চলছে। চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৯০ দশমিক ১ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮৬ দশমিক ২৪ শতাংশ।
প্রকল্পের পিডব্লিউ-৬ প্যাকেজের আওতায় লৌহজং উপজেলার গাঁওদিয়া এলাকায় ৫০০ মিটার এবং বেজগাঁও আশ্রয়ণ এলাকায় ২৫০ মিটার মোট ৭৫০ মিটার নদী তীর সংরক্ষণ কাজ চলমান রয়েছে। ইতোমধ্যে স্লুপে সিসি ব্লক স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যেই গত ১২ জুলাই গাঁওদিয়া এলাকায় স্থায়ী প্রতিরক্ষা কাঠামোর একটি অংশে হঠাৎ ধস নামে। ভাঙন আতঙ্কে তিনটি পরিবার দ্রুত তাদের বসতঘর নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নেয়। পরে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও কংক্রিট ব্লক ফেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
ধসের কারণ অনুসন্ধানে ১৪ জুলাই পরিচালিত তলদেশের গভীরতা জরিপে ভাঙনস্থলে নদীর গভীরতা ২৫ দশমিক ৩১ মিটার পাওয়া যায়, যা নকশা প্রণয়নের সময়কার তুলনায় অনেক বেশি। পাউবো বলছে, বর্তমানে নদীর গভীরতম প্রবাহরেখা বামতীর ঘেঁষে প্রবাহিত হওয়ায় প্রতিরক্ষা কাঠামোর নিচে স্রোতের চাপ ও মাটির ক্ষয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৭ জুলাই জরিপের প্রতিবেদন দেওয়া হয়।
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এনামুল হক জানান, প্রকল্পের নকশা তৈরির সময় যে অংশটি শাখা চ্যানেল ছিল, পদ্মার ধারাবাহিক রূপগত পরিবর্তনে সেটিই এখন মূল নদীর অংশে পরিণত হয়েছে। মাঝখানের চর প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়ায় বিদ্যমান নকশা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
পাউবোর তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে লৌহজংয়ের বামতীরের প্রায় তিন কিলোমিটার প্রশস্ত চর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। একই সময়ে পদ্মা রিসোর্টও নদীতে হারিয়ে গেছে।
নদীর পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় ২০২৪ সালে পাউবো একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে। কমিটি বিদ্যমান প্রতিরক্ষা কাজ শক্তিশালী করতে অতিরিক্ত ২৫-৩০ ঘনমিটার/মিটার জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে প্রকল্পে নতুন ছয়টি শক্তিশালীকরণ প্যাকেজ এবং দুটি নতুন তীর সংরক্ষণ কাজ যুক্ত করা হয়। বাঁধের পাদদেশে পাথরের জিওব্যাগ ডাম্পিংও বাড়ানো হয়। তবে সর্বশেষ তলদেশের গভীরতা জরিপে দেখা যায়, বর্তমান ৬০ ঘনমিটার/মিটার ডাম্পিং ভলিউমও ভবিষ্যতের জন্য পর্যাপ্ত নাও হতে পারে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মধ্যবর্তী মূল্যায়ন কমিটি ২০২৪ সালে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ দেয়। এর মধ্যে রয়েছে– পদ্মা নদীর পরিবর্তিত রূপগত বিবেচনায় প্রতিরক্ষা কাজ আরও শক্তিশালী করা; প্রয়োজনে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পুনরায় সংশোধন; প্রকল্প এলাকায় সার্বক্ষণিক তদারকি নিশ্চিত করা; আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়মিত মনিটরিং ও পদ্মার রূপগত পরিবর্তন নিয়ে বিশেষায়িত গবেষণা পরিচালনা।
মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখলাক উল জামিলের মতে, পদ্মার সর্বশেষ তরলচাপ-নির্ভর (হাইড্রোলিক) ও রূপগত (মরফোলজিক্যাল) তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা নকশা নিয়মিত পর্যালোচনা এবং প্রয়োজনীয় শক্তিশালীকরণ না করলে লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ীর বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘমেয়াদে আরও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে কেবল চলমান প্রকল্প শেষ করাই নয়, বরং সর্বশেষ তরলচাপ-নির্ভর ও রূপগত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা নকশা নিয়মিত পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় শক্তিশালীকরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে হবে।
- বিষয় :
- পদ্মা