ঢল নামলেই দুর্ভোগে ৫ লাখ মানুষ
ঢলের পানিতে ডুবে যাওয়া তাহিরপুর-বিশ্বম্ভরপুর-সুনামগঞ্জ মহাসড়কের কজওয়ের একাংশ। মঙ্গলবারে ছবি সমকাল
আমিনুল ইসলাম, তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ)
প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
ভারী বৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢল নামলেই তলিয়ে যায় সেতুর সংযোগ সড়ক। সেতু পারাপার বিঘ্নিত হওয়ায় সড়কপথে পার্শ্ববর্তী এলাকার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তাহিরপুর উপজেলার যোগাযোগব্যবস্থা। একই সঙ্গে ভোগান্তিতে পড়তে হয় আরও দুই উপজেলার মানুষকে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় সার্বিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয় স্থানীয়দের। বড় একটি জনগোষ্ঠী রীতিমতো অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
স্থানীয়রা জানান, প্রতি মৌসুমেই সড়কপথে এমন দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর ও মধ্যনগর–এই তিন উপজেলার প্রায় ৫ লাখ মানুষকে। পানি নামার আগ পর্যন্ত এ পথে স্থানীয়দের চলাচল বন্ধ থাকে মাসের পর মাস।
জেলার বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম তাহিরপুর-বিশ্বম্ভরপুর-সুনামগঞ্জ সড়ক। তাহিরপুর থেকে সুনামগঞ্জ সড়কটির মোট দৈর্ঘ্য ৩৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে তাহিরপুর অংশের আনোয়ারপুর বাজার থেকে বালিজুরী গ্রাম পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এবং বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শক্তিয়ারখলা সেতুর সংযোগ থেকে ভাটিপাড়া মোকাম পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার সড়ক জেলা এলজিইডির আওতাধীন।
ওই সড়কের অবশিষ্ট ২৫ কিলোমিটার সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের অধীনে। পাহাড়ি ঢলের পানি সহজে নিষ্কাশনের জন্য মোট ৩৩ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে কয়েকটি স্থানে কজওয়ে (পানি সরে যাওয়ার জন্য নিচু করে নির্মিত পাকা রাস্তা) রাখা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে তাহিরপুর উপজেলার আনোয়ার সেতুর পূর্ব পাশের ৫০ মিটার সংযোগ সড়ক, বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার শক্তিয়ারখলা বাজারের পূর্ব পাশে ১০০ মিটার সড়ক এবং দুর্গাপুর মোকাম বাড়ি এলাকায় ১০০ মিটার সড়ক।
সড়কের এসব অংশ দিয়ে ঢলের পানি হাওরে নেমে গেলেও নিচু অংশগুলো (বিশেষ করে মোকাম বাড়ি ও শক্তিয়ারখলা অংশ) কয়েক মাস পানিতে নিমজ্জিত থাকে। হাওরের পানির লেভেল সড়কের চেয়ে ওপরে থাকায় ঢল থামলেও পানি আর নামে না। ফলে বিশ্বম্ভরপুর থেকে তাহিরপুর বা জেলা সদরে যেতে সাধারণ মানুষকে ভেঙে ভেঙে নৌকায় চলাচল করতে হয়।
এই পথের ভোগান্তির প্রভাব পড়ছে বিখ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওরে আসা পর্যটকদের ওপরও। পর্যটক টুটুল আহমেদ জানান, বর্ষাকালে রাস্তাটি তলিয়ে থাকায় পর্যটকরা সরাসরি গাড়িতে তাহিরপুর না গিয়ে সুনামগঞ্জ থেকেই হাউসবোটে যাতায়াত করেন। এতে তাঁদের নৌকায় অতিরিক্ত ৩ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়।
অটোরিকশাচালক বিজন দাস জানান, তিন স্থানে পানি থাকায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সরাসরি সুনামগঞ্জে যাতায়াত করা যাচ্ছে না। দুর্গাপুর মোকাম বাড়ির সামনের সড়কে এখনও প্রায় ৪ ফুট পানি রয়েছে। তাহিরপুর আলিম মাদ্রাসার প্রভাষক আসিকুর রহমান বলেন, চাকরির তাগিদে বিশ্বম্ভরপুর সদর থেকে তাহিরপুরের ২০ কিলোমিটার রাস্তা প্রতিনিয়ত পাড়ি দিতে হয়। বর্ষাকালে দুই বার নৌকা বদলে চলতে হয়।
বালিজুড়ি ইউপি চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন জানান, সড়কের তিনটি স্থানে প্রায় ৩০০ মিটার সড়ক অতিরিক্ত নিচু। পাহাড়ি ঢল শেষে পানি নেমে গেলেও স্থানগুলো মৌসুমজুড়েই ডুবে থাকে।
গত ১১ জুলাই সড়কটির দুর্দশা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বাদাঘাট দক্ষিণ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছবাব মিয়া জানান, পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক প্রয়োজনীয় কালভার্ট নির্মাণ এবং সড়কের উভয় পাশে সীমানা চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
সড়কটির এই করুণদশা প্রসঙ্গে সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার হোসেন জানান, শক্তিয়ারখলা সড়কের এই স্থানটিতে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে পাকা রাস্তা ভেঙে যেত। তাই অধিদপ্তরের নির্দেশে কজওয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে এ রাস্তাটি নিয়ে ২০১২ সালে এক ঠিকাদার ২০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করে এলজিইডির বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। এই আইনি জটিলতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
- বিষয় :
- বন্যা