টান দিলেই উঠে যাচ্ছে ঢালাই
এস, এম মজনুর রহমান, মনিরামপুর (যশোর)
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দারিদ্র্য হ্রাসকরণ ও বস্তি এলাকার পিছিয়ে পড়া মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বরাদ্দ হয়েছিল প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। কিন্তু যশোরের মনিরামপুর প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় সেই বস্তি উন্নয়ন প্রকল্পের পুরোটাই পরিণত হয়েছে হরিলুটে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে বস্তি বাদ দিয়ে উন্নয়নকাজ চালানো হচ্ছে শহরের অভিজাত ও সাধারণ এলাকায়। নারীদের দিয়ে ‘কাগজে-কলমে’ উন্নয়ন কমিটি বানিয়ে পৌরসভার কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিজেরাই নেমে পড়েছেন ঠিকাদারিতে। এরই মধ্যে দুই কিস্তিতে তোলা হয়েছে এক কোটি ২১ লাখ টাকা। শুধু তা-ই নয়, আরসিসি ড্রেন ও ফুটপাত নির্মাণে এমন নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে যে, স্থানীয়রা হাত দিয়েই তুলে ফেলছেন সদ্য দেওয়া ঢালাই।
পুতুল কমিটি, নেপথ্যে কর্মচারীদের ঠিকাদারি
পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউজিআইপি) আওতাধীন লিনিক প্রকল্পের মাধ্যমে ২০২৪ সালে পাঁচটি বস্তি এলাকার জন্য প্রায় পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি ব্লকে ১১ সদস্যের ‘নিম্ন আয় কমিউনিটি উন্নয়ন কমিটি’ বা লিনিক কমিটির নেতৃত্বে সরাসরি কেনাকাটা ও তদারকি সম্পন্ন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। স্থানীয় একজন নারীকে চেয়ারপারসন এবং পৌরসভার একজন কর্মচারীকে সদস্য সচিব করে কমিটিগুলো গঠিত হয়। তাঁদের যৌথ তদারকিতে কেনাকাটা ও কাজ বাস্তবায়নের কথা। তবে বাস্তবে মহাদেবপুরের দাসপাড়া, দুর্গাপুরের মহলদার পাড়া, তাহেরপুরের মণ্ডলপাড়া, জুড়ানপুর ও বিজয়রামপুরের কমিটিগুলোর অধিকাংশ সদস্যই প্রকল্প সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী উত্তম মজুমদারের আস্থাভাজন কার্যসহকারী তপু এস এম আব্দুর রশিদসহ কয়েকজন কর্মচারী কেনাকাটা থেকে শুরু করে পুরো কাজের ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করছেন। প্রথম কিস্তির কাজ শেষে এক কোটি ২১ লাখ টাকা তোলার ক্ষেত্রেও লিনিক কমিটির সভাপতি ও সদস্য সচিবদের যৌথ অ্যাকাউন্ট থেকে কেবল স্বাক্ষর বানিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বিজয়রামপুর লিনিক কমিটির সদস্য সচিব শিরিনা খাতুন, জুড়ানপুরের বিউটি রানী বিশ্বাস ও দুর্গাপুরের বিএম মাসুম বেলাল আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমরা খাতাকলমে সদস্য সচিব। কর্মকর্তাদের নির্দেশে কেবল রেজুলেশন আর চেকে স্বাক্ষর করা ছাড়া কাজের কোনো কিছুই আমাদের জানা নেই।’
কথা হলে মহাদেবপুরের দাসপাড়া লিনিক কমিটির চেয়ারপারসন পূর্ণিমা রানীর স্বামী ভগীরত জানান, তাঁর স্ত্রী কাজের কিছুই জানেন না, সব কাজ করছেন ঠিকাদার তপু।
কাজের মান নিয়ে আইইউজিআইপির অসন্তোষ
ড্রেন ও ফুটপাত তৈরিতে গুরুতর অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে সরেজমিনেও। চার ইঞ্চি পাথরের ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে দুই থেকে আড়াই ইঞ্চি। বিজয়রামপুরে নির্মিত কাজ পরিদর্শনে এসে প্রকল্প কর্তৃপক্ষের (আইইউজিআইপি) উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিদলও চার ইঞ্চির জায়গায় আড়াই ইঞ্চি ঢালাই পাওয়ার সত্যতা পায়। অনিয়মে ক্ষুব্ধ হয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দিলেও সে আদেশ তোয়াক্কা করেনি প্রভাবশালী কর্মচারী সিন্ডিকেট।
বিজয়রামপুরের বাসিন্দা ইজাহার আলী (৭৮) বলেন, ‘আমাদের এলাকার ড্রেন সংস্কারের কথা বলে যে ঢালাই দেওয়া হয়েছে, তা হাত দিলেই গুঁড়ো হয়ে ভেঙে যাচ্ছে। বস্তির লোকজনের কথা বলে টাকা এনে অফিসাররা নিজেরা পকেট ভরছেন। আমরা এই জোড়াতালির কাজ মানি না।’
অভিযোগ অস্বীকার করে মহাদেবপুর লিনিক কমিটির সদস্য সচিব ও পৌরসভার কার্যসহকারী তপু এস.এম আব্দুর রশিদ দাবি করেন, নিয়ম মেনেই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। অন্যদিকে পৌরসভার প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী উত্তম মজুমদারও কোনো অনিয়ম হয়নি দাবি করে জানান, কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। কাজের কোয়ালিটির ব্যাপারে কোনো ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।
পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সম্রাট হোসেন বলেন, ‘কাজের বিল উত্তোলনে আমার কোনো স্বাক্ষরের প্রয়োজন পড়ে না। লিনিক কমিটির যৌথ অ্যাকাউন্ট থেকে
তারা এক কোটি ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। তবে তদন্ত করে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
- বিষয় :
- রাস্তা