দু’দফা উদ্বোধনের পরেও চালু হয়নি আইসিইউ’র কার্যক্রম
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৭
| প্রিন্ট সংস্করণ
একবার করোনা ডেডিকেটেড আবার হাম ডেডিকেটেড ইউনিট–দুই দফায় পৃথক দুই নামে উদ্বোধন হলেও কার্যত সেবা কার্যক্রম চালু হয়নি সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের ১০ শয্যার ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র। কাগজে-কলমে উদ্বোধন সম্পন্ন হলেও বাস্তবে বন্ধ রয়েছে এই জীবনরক্ষাকারী সেবাপ্রদানের বিশেষ ইউনিটের কার্যক্রম।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, উদ্বোধনের পর অবকাঠামোর কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। সেগুলোর সংস্কার কাজ চলমান থাকায় আইসিইউ সচল করা সম্ভব হয়নি।
জেলার ২৬ লাখ মানুষের উন্নত চিকিৎসার একমাত্র সরকারি ভরসাস্থল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল। করোনা মহামারির সময় হাসপাতালের অষ্টম তলায় অবস্থিত আইসিইউর অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এরপর ২০২৩ সালে করোনা ডেডিকেটেড আইসিইউ হিসেবে প্রথম দফায় ইউনিটটি উদ্বোধন করা হলেও সেখানে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা চালু হয়নি। এতে দীর্ঘদিন ধরে মূল্যবান যন্ত্রপাতিসহ পুরো ইউনিটটি কার্যত অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে।
সম্প্রতি দেশে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে চলমান পরিস্থিতিকে সামনে রেখে একই ইউনিটকে হাম ডেডিকেটেড আইসিইউ হিসেবে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। এর অংশ হিসেবে গত ১৪ জুন দ্বিতীয় দফায় আনুষ্ঠানিকভাবে এটি উদ্বোধন করা হয়। তবে উদ্বোধনের পরও আইসিইউতে রোগী ভর্তি বা চিকিৎসাসেবা শুরু হয়নি। ফলে দুই দফা উদ্বোধনের পরও জীবনরক্ষাকারী এই বিশেষায়িত ইউনিটটি কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সুনামগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ রয়েছে ৭৪টি। এর মধ্যে ৩টি প্রশাসনিক পদ বাদ দিলে ৭১ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২০ জন। ৪৭ জন মেডিকেল অফিসারের পদের বিপরীতে আছেন মাত্র ১২ জন এবং ২৪ জন কনসালট্যান্টের জায়গায় রয়েছেন আটজন।
বিভাগভিত্তিক হিসেবে মেডিসিনে একজন, সার্জারিতে দু’জন, শিশু বিভাগে একজন, গাইনি বিভাগে একজন এবং অ্যানাস্থেশিয়া বিভাগে মাত্র তিনজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। এই সীমিত জনবল দিয়েই হাসপাতালের পুরো চিকিৎসাসেবা পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগ ও আন্তঃবিভাগ মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। প্রকট জনবল সংকটের মধ্যে বিপুল সংখ্যক রোগীকে সেবা দিতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মকর্তা জানান, আইসিইউ ইউনিট পূর্ণাঙ্গভাবে চালু রাখতে অন্তত চারজন কনসালট্যান্ট, ১০ জন মেডিকেল অফিসার, ১৬ জন নার্স এবং ১২ জন ওয়ার্ডবয়ের প্রয়োজন। আইসিইউর জন্য কোনো পৃথক জনবল বরাদ্দ না থাকায় হাসপাতালের বিদ্যমান জনবল দিয়েই এই সেবা পরিচালনার কথা বলা হচ্ছে। অথচ বর্তমান জনবল দিয়ে হাসপাতালের নিয়মিত চিকিৎসাসেবাই ব্যাহত হচ্ছে। এ কারণেই দুই দফা উদ্বোধনের পরও আইসিইউর কার্যক্রম চালু রাখা সম্ভব হয়নি। তবে নার্সের কোনো সংকট নেই বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সুনামগঞ্জ জেলার সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খলিল রহমান বলেন, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলার মানুষের সর্বোচ্চ সরকারি স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র হলো সদর হাসপাতাল। অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে এখানে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসকের তীব্র সংকট বিরাজ করছে। এর মধ্যেই সম্প্রতি চারজন চিকিৎসককে মেডিকেল কলেজে বদলি করা হয়েছে। অথচ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্যক্রম এখনও শুরু হয়নি। আবার কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যেও কেউ কেউ অনিয়মিত। প্রয়োজনীয় জনবল ও সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করে বারবার আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন করা কেবল লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট শেরেনুর আলী বলেন, জনবলই যদি না থাকে, তবে আইসিইউ উদ্বোধনের যৌক্তিকতা নেই। সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। আশা করা হচ্ছে, সরকার দ্রুত প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগসহ বিদ্যমান সংকট দূর করে সেবার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক আহমদ হোসেন বলেন, হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ২৫০ শয্যা হলেও প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী ভর্তি থাকেন। এছাড়া বহির্বিভাগে প্রতিদিন এক হাজারের বেশি এবং জরুরি বিভাগে আরও ৫০০ থেকে ৬০০ রোগী সেবা নেন। এই বিপুল সংখ্যক রোগীকে সীমিত জনবল দিয়ে সেবা দেওয়ার সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। আশা করছি, দ্রুত চিকিৎসক সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।
চিকিৎসকদের অনিয়মিত উপস্থিতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগে যেসব অপারেশনের জন্য রোগীদের সিলেটে যেতে হতো, এখন ল্যাপারোস্কপির মাধ্যমে পিত্তথলি ও অ্যাপেনডিসাইটিসের মতো অপারেশন এখানেই হচ্ছে। দ্রুতই ল্যাপারোস্কপিক হার্নিয়া অপারেশনও শুরু করার প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া লঙ্গো ও ফিস্টুলার মতো অপারেশন নিয়মিত হচ্ছে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের আন্তরিকতার কারণেই এই বিশেষায়িত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
আইসিইউ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, উদ্বোধন হলেও চালুর প্রস্তুতির সময় কিছু অবকাঠামোগত ত্রুটি ধরা পড়েছে। সেগুলো দ্রুত সংস্কারের কাজ চলছে। আশা করা যায়, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আইসিইউর কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে।
- বিষয় :
- আইসিইউ