ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মসজিদের দান নিয়ে মন্তব্যের জেরে নেত্রকোনায় দুজনের মাথা ন্যাড়া, গর্দান কাটার হুমকি

মসজিদের দান নিয়ে মন্তব্যের জেরে নেত্রকোনায় দুজনের মাথা ন্যাড়া, গর্দান কাটার হুমকি
×

ম্যাপ

নেত্রকোনা প্রতিনিধি

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৩:০৩ | আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৪২

নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলায় মসজিদের দান এবং ইমামের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে মন্তব্যের জেরে সালিশে দুই ব্যক্তির মাথা ন্যাড়া করা হয়েছে। এ ছাড়া তাদের গর্দান কাটার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

গত বুধবার বিকেলে উপজেলার সাহতা ইউনিয়নের মধুপুর কওমি মাদ্রাসায় এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার একটি ভিডিও গত বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে আইন হাতে তুলে নেওয়ার এ ঘটনায় সমালোচনার ঝড় ওঠে।

স্থানীয় কলেজছাত্র জনি খানের ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে প্রচারিত ১ মিনিটের ভাইরাল এই ভিডিওতে দেখা যায়, সালিশে দেওয়া শাস্তি কার্যকর করছেন দুই যুবক।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, মধুপুর কওমি মাদ্রাসার বারান্দায় ওই দুজনের মাথা ন্যাড়া করা হয়। ভুক্তভোগী দুজন হলেন– মধুপুর গ্রামের মুমিন খান (৫০) এবং পাশের হেলুচিয়া গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বী যুবক উজ্জ্বল (৩২)। মাদ্রাসার শিক্ষক আলী আহমদ সালিশে এই শাস্তি ঘোষণা করেন। এই শাস্তি যথেষ্ট নয়, দুজন গর্দান কাটার অপরাধ করেছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জানা গেছে, গত সোমবার হেলুচিয়া বাজারের মসজিদের ইমামের বেতন বৃদ্ধি নিয়ে সভা হয়। সভা শেষে মসজিদের দান সংগ্রহের প্রসঙ্গ উঠলে মুমিন খান মসজিদ সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। এ সময় উজ্জ্বলও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। পরে বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে বাজার ও মসজিদ কমিটির কাছে তাদের বিরুদ্ধে বিচার দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একটি অংশ।

কলেজছাত্র জনি খান জানান, সালিশে তাদের মন্তব্যের ব্যাখ্যা ও প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে সময় দেওয়া হয়েছিল। তারা প্রকাশ্যে ক্ষমা না চাওয়ায় সালিশে মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগী মুমিন খান বলেন, গত সোমবার হেলুচিয়া বাজারের একটি চায়ের দোকানে কয়েকজন মিলে বসে চা পান করার সময় মসজিদের ইমামের বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছিল। এক ব্যক্তি মন্তব্য করেছিলেন, ‘হুজুরদের লোভ বেড়ে গেছে।’ এর জবাবে তিনিও সহমত প্রকাশ করেছিলেন। পরে ওই কথাকে বিকৃতভাবে প্রচার করে তাঁকে লাঞ্ছিত করা হয়। সালিশের নামে তাঁকে বলা হয়, তাঁর স্ত্রী তালাক হয়ে গেছে। মুসলমানিত্ব চলে গেছে। তওবা পড়ানো হয়। এ ছাড়া তাঁর গলায় জুতার মালা পরানোর কথা বলা হয়। এই শাস্তি যথেষ্ট নয়, তাঁর গর্দান কাটার হুমকি দেওয়া হয়। পরে অপমানজনকভাবে তাঁর মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হয়।

মুমিন আরও বলেন, ‘আমরা মাদ্রাসার শিক্ষক আলী আহমদের ষড়যন্ত্রের শিকার। আমি যে কথা বলিনি, সেটি রটিয়ে দিয়ে আমাকে জবাই করার হুমকি দিয়েছে। আমাদের অপমান অপদস্থ করেছে। অপমানে আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করছিল। স্বজনের কথা চিন্তা করে আমি তা পারিনি। আমি এই অন্যায়ের বিচার চাই। আমি থানায় যাব।’

অভিযোগের বিষয়ে মাদ্রাসার শিক্ষক ও মোহতামিম আলী আহমদ বলেন, ‘মুমিন গ্রামের মসজিদ সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করেছিল। অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রাম্য সালিশ বসে এবং সেখানে বিষয়টি নিয়ে বিচার করা হয় ও বিচারের এক পর্যায়ে স্থানীয়দের চাহিদা অনুসারে তাদের মাথা ন্যাড়া করা হয়।’

উজ্জ্বলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এলাকাবাসীর অভিযোগ ছিল, সে কোনো মন্তব্য না করলেও মুমিনের বক্তব্যের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছিলেন। এ জন্য তাঁকেও শাস্তি দেওয়া হয়েছে।’ হত্যার হুমকির অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন।

মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক রঙ্গু মিয়া বলেন, ‘আমি এই বিষয়টি জানি না। এ ছাড়া সালিশেও ছিলাম না। এ ব্যাপারে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তবে কেউ অপরাধ করলে প্রচলিত আইনে বিচার করা প্রয়োজন। আইন হাতে তুলে নেওয়া ঠিক না।’

জানতে চাইলে বারহাট্টা থানার ওসি চম্পক দাম বলেন, সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পুলিশ দেখেছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে ঘটনাস্থলে বুধবার রাতে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় থানায় কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। ঘটনার প্রকৃত সত্যতা যাচাই করা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন

×