মৌসুম শেষেও জমজমাট আমের বাজার, দামে খুশি কৃষক
দেশের সর্ববৃহৎ আমের মোকাম নওগাঁর সাপাহার বাজারে ভিড় জমেছে ক্রেতা ও বিক্রেতার। গতকাল শুক্রবার তোলা সমকাল
কাজী কামাল হোসেন, নওগাঁ
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৬
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের সর্ববৃহৎ আমের মোকাম নওগাঁর সাপাহার আমের বাজারে মৌসুম প্রায় শেষ। অধিকাংশ বাগান ইতোমধ্যে আমশূন্য। কিন্তু ঠিক এই সময়েই নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে বাজার। সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক জাতের আমের দাম ভরা মৌসুমের তুলনায় দ্বিগুণ থেকে কয়েক গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বেড়েছে আম্রপালি ও ব্যানানা ম্যাংগো জাতের আম।
ব্যবসায়ীরা জানান, বাজারে এখন প্রতিদিন আমের পরিমাণ কমছে। ফলে ভালো মানের আম পেলেই পাইকারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে এবং দরও বাড়ছে।
সরেজমিনে শুক্রবার সাপাহার আমের হাট ঘুরে দেখা যায়, ভোর থেকেই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের চাষিরা ব্যাটারিচালিত ভ্যান, শ্যালোচালিত যানবাহন ও পিকআপে ক্যারেটভর্তি আম নিয়ে বাজারে আসছেন। যদিও ভরা মৌসুমের তুলনায় আমের পরিমাণ অনেক কম, তবু বাজারে ক্রেতার ভিড় কমেনি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা পাইকাররা ভালো মানের আম সংগ্রহে একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছেন। ব্যবসায়ীদের হিসাবে, বর্তমানে এই বাজারে প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৭ কোটি টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে।
এখন বাজারে হিমসাগর, ল্যাংড়া, নাক ফজলি ও হাড়িভাঙ্গা প্রায় নেই বললেই চলে। বর্তমানে অল্প পরিমাণে আম্রপালি, নাভি (ব্যানানা ম্যাংগো), বারি-৪, আশ্বিনা, গৌড়মতি ও কাটিমন বিক্রি হচ্ছে। ভরা মৌসুমে প্রতিমণ এক হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার ২০০ টাকা দরের আম্রপালি বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অর্থাৎ মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় চার থেকে পাঁচ গুণ। এ ছাড়া প্রতিমণ দুই হাজার ৮০০ থেকে তিন হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হওয়া ব্যানানা ম্যাংগো জাতের আমের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া প্রতিমণ বারি-৪ চার থেকে আট হাজার টাকা, কাটিমন ও গৌড়মতি তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা এবং আশ্বিনা জাতের আম দুই থেকে তিন হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
সাপাহারের আম ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতিবছরই মৌসুমের শেষ দিকে বাগানে আম কমে যায়। সরবরাহ কমে গেলেও বাজারে ভালো মানের আমের চাহিদা থেকে যায়। ফলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বাড়ে। তবে এ বছর তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে অধিকাংশ জাতের আম আগেভাগেই পেকে যাওয়ায় ভরা মৌসুমে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছিল। তখন দাম ছিল সবচেয়ে কম। এখন সেই অতিরিক্ত সরবরাহ না থাকায় বাজার পুরোপুরি বিক্রেতা নির্ভর হয়ে উঠেছে।
আমচাষি মানিক বলেন, ‘মৌসুমের শুরুতে দাম এত কম ছিল যে অনেকেই উৎপাদন খরচ তুলতে পারেননি। এখন শেষদিকে এসে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। এতে কৃষকরা খুশি। কিন্তু প্রথমে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া কঠিন।’
অপর চাষি রুবেল হোসেন বলেন, ‘এখন বাজারে আম কম। তাই ভালো মানের নাভি ও বারি-৪ আমের চাহিদা অনেক বেশি। যারা শেষ সময় পর্যন্ত আম ধরে রাখতে পেরেছেন, তারা লাভবান হচ্ছেন।’
সাপাহার আম ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসেন রিফাত জানান, এখন আমের মৌসুম শেষভাগে। বর্তমানে মূলত নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জেই আম পাওয়া যাচ্ছে। বাজারে সরবরাহ যত কমবে, ততই দাম বাড়বে।
রপ্তানি শিল্প স্থাপনে বদলে যাবে অর্থনীতি
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে নওগাঁ জেলায় ৩০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে চার লাখ টন। আমকে ঘিরে এ বছর জেলার অর্থনীতিতে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হওয়ার আশা করছে কৃষি বিভাগ।
সাপাহারের বরেন্দ্র এগ্রো লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা বলেন, নওগাঁর লেট ভ্যারাইটিজ (নাবি জাতের) আম এখন দেশের বাজারে আলাদা অবস্থান তৈরি করেছে। কিন্তু শুধু কাঁচা ফল বিক্রির ওপর নির্ভর করলে চাষিরা কখনও স্থায়ীভাবে লাভবান হতে পারবেন না। প্রয়োজন আধুনিক কোল্ড স্টোরেজ, আম প্রক্রিয়াজাত শিল্প, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকিং ব্যবস্থা এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ। মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে যে দাম পড়ে যায়, সেই চাপ কমাতে সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে ব্যানানা ম্যাঙ্গো, বারি-৪, আম্রপালি ও অন্যান্য লেট ভ্যারাইটিজ আমের আন্তর্জাতিক বাজার রয়েছে। সঠিক বিপণন কৌশল গ্রহণ করা গেলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই এই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে।
নওগাঁ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনজুর রহমান বলেন, মৌসুমের শেষ সময়ে এসে চাষিরা ভালো দাম পাচ্ছেন। লেট ভ্যারাইটিজ আমের চাষ আরও সম্প্রসারণে কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা মৌসুমের শেষেও লাভজনক বাজার ধরতে পারেন।
- বিষয় :
- কৃষক