ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নিষেধাজ্ঞা কাগজেই, অভয়ারণ্যে শিকার

নিষেধাজ্ঞা কাগজেই, অভয়ারণ্যে শিকার
×

সুন্দরবনের পুষ্পকাটি অভয়ারণ্যে সম্প্রতি গড়ে তোলা জেলেদের অস্থায়ী স্থাপনা সমকাল

শেখ হারুন অর রশিদ, কয়রা (খুলনা) 

প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুন্দরবনে তিন মাসের প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা চললেও অবৈধভাবে জেলে নৌকা ও ট্রলার পাঠিয়ে নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ ও কাঁকড়া শিকারের অভিযোগ উঠেছে ‘মোজাফ্‌ফর কোম্পানি’ নামে পরিচিত এক মাছ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে। অভিযোগে বলা হয়েছে, দাদনের ফাঁদে ফেলে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের অভয়ারণ্য এলাকায় জেলেদের পাঠানো হচ্ছে। সেখানে বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার, বন্যপ্রাণী নিধন এবং শুঁটকি তৈরির জন্য বনের ভেতরে চাতাল গড়ে তোলার মতো কর্মকাণ্ডও চলছে।

প্রতিবছর জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের সম্পদ আহরণ ও প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখে বন বিভাগ। পাশাপাশি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এলাকায় সারাবছরই প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। কিন্তু স্থানীয় জেলেদের দাবি, সাধারণ জেলেরা এ সময়ে বনে যেতে না পারলেও মোজাফ্‌ফর কোম্পানির জেলেদের কার্যক্রম বন্ধ থাকে না। এ ছাড়া সারাবছর তারা অভয়ারণ্য এলাকার  খাল ও নদী দখলে নিয়ে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করছেন। বনের মধ্যে চাতাল বানিয়ে শুঁটকি তৈরির কারখানাও গড়ে তুলেছে মোজাফ্ফর বাহিনী। সেখানে প্রতিদিন বনের কাঠ পোড়ান হচ্ছে। 
উপজেলার হরিণখোলা গ্রামের জেলে আলাউদ্দীন শেখ জেলা প্রশাসক, বন বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দেওয়া লিখিত অভিযোগে দাবি করেছেন, গত দুই বছর তিনি মোজাফ্‌ফর কোম্পানির কাছ থেকে দাদন নিয়ে কাগাদোবেকি ফরেস্ট ক্যাম্পের আওতাধীন নিষিদ্ধ খালে মাছ ও কাঁকড়া শিকার করেছেন। পরে মাছ বিক্রির অর্থ নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে তাঁর নৌকা, জাল ও মাছ পরিবহনের ট্রলার ছিনিয়ে নেওয়া হয় এবং ট্রলারে থাকা প্রায় ১০ লাখ টাকার মাছ লুট করা হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন। 

আলাউদ্দীন শেখ আরও দাবি করেন, নীলকমল, পাটকোস্টা, মান্দারবাড়িয়া, নোটাবেকি ও পুষ্পাকাটি এলাকার বিস্তীর্ণ অভয়ারণ্য অঞ্চলে সাধারণ জেলেরা প্রবেশ করতে না পারলেও মোজাফ্‌ফর কোম্পানির  দুই শতাধিক জেলে নিয়মিত মাছ ও কাঁকড়া শিকার করে। তাদের প্রত্যেকের আলাদা সাংকেতিক কার্ড রয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
এই অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন মোজাফ্‌ফর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে কাজ করা কয়েকজন জেলে ও ট্রলারচালক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় ওই ব্যবসায়ীর জেলেরা অবাধে চলাচল করেন এবং বড় ধরনের অভিযান চালানোর আগেই সতর্কবার্তা পৌঁছে যায়।
নিষেধাজ্ঞার সময় কেন বনে যান প্রশ্ন করলে একজন বলেন, নিজেদের নৌকা ও মাছ ধরার সরঞ্জাম না থাকায় মহাজনের দাদনের ওপর ভরসা করতি হয়। তা ছাড়া বাদায় ডাকাত আর ফরেস্টার ম্যানেজ কইরে চলবার মতোন সামর্থ্যও আমাগের নেই। বাধ্য হয়ে মহাজনের হইয়ে কাজ করি। 
স্থানীয় কয়েকজন মাছ ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, অভয়ারণ্য এলাকায় মাছ ধরতে হলে এখন বন বিভাগের চেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে এই ব্যবসায়ী চক্র। তাদের অনুমতি ছাড়া ব্যবসা করতে গেলে নানা ধরনের হয়রানির মুখে পড়তে হয় বলে তারা দাবি করেন। 

পাথরখালি গ্রামের জেলে কামরুল ইসলাম বলেন, নিজেদের নৌকা ও মাছ ধরার সরঞ্জাম না থাকায় মহাজনের দাদনের ওপর ভরসা করতি হয় আমাগের মতো জাইলেদের। তা ছাড়া বাদার ডাকাত আর ফরেস্টার ম্যানেজ কইরে চলবার মতোন সামর্থ্য আমাগের নেই। তাই মহাজনের হইয়ে কাজ করি। তারা যখন যে নির্দেশনা দেয় তাই পালন করতি হয়। আগে অনেক মহাজনের হয়ে কাজ করিছি। কিন্তুক মোজাফ্‌ফর কোম্পানি ছাড়া আর কেউ বাদায় ঢুকতি পারতেছে না।  একজন আড়তদার বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময়ও প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাছ ও কাঁকড়া বাজারে আসছে, যা স্বাভাবিক নয়।
উপকূল ও সুন্দরবন সুরক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে এই সময়েই সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি অবৈধ মাছ ও কাঁকড়া আহরণ হয়। প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও দাদনচক্রের কারণে বন বিভাগের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হচ্ছে না।’
অভিযোগ অস্বীকার করে মাছ ব্যবসায়ী মোজাফ্‌ফর হোসেন বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে বৈধভাবে ব্যবসা করছি। প্রতিপক্ষ ব্যবসায়ীরা আমার সুনাম নষ্ট করতে জেলেদের দিয়ে এসব বানোয়াট অভিযোগ করাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, “আমার কোনো কার্ডধারী জেলে নেই এবং আমি কাউকে নিষিদ্ধ এলাকায় পাঠাই না।”
সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এ জেড এম হাছানুর রহমান বলেন, ‘অবৈধ প্রবেশ ও সম্পদ আহরণের অভিযোগ পেলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। অভিযানে মাছ, কাঁকড়া ও হরিণ শিকারের ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে।’ তবে তিনি বলেন, ‘মোজাফ্‌ফর কোম্পানির জেলেরা অভয়ারণ্য এলাকায় অবস্থান করছে– এমন সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। নির্দিষ্ট তথ্য পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ইনিশিয়েটিভ ফর কোস্টাল ডেভেলপমেন্টের (আইসিডি) পরিচালক আশিকুর রহমান বলেন, ‘অভয়ারণ্য এলাকায় বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার হলে তা শুধু মাছ নয়, ডলফিন, কচ্ছপ, কাঁকড়া ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর ওপরও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।’ তিনি অবিলম্বে এলাকায় জেলে ও ট্রলারের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন।
 

আরও পড়ুন

×