ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

তারাব পৌরসভায় দুই মাস পানি সরবরাহ কার্যত বন্ধ

তারাব পৌরসভায় দুই মাস  পানি সরবরাহ কার্যত বন্ধ
×

রূপগঞ্জের তারাব পৌরসভার যাত্রামুড়া পাম্প হাউসের সামনে পানি সংগ্রহের জন্য নারীদের দীর্ঘ অপেক্ষা। গতকাল শুক্রবার তোলা সমকাল

রূপগঞ্জ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১১

| প্রিন্ট সংস্করণ

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার শিল্পাঞ্চল খ্যাত তারাব পৌরসভায় টানা দুই মাস ধরে পানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লাখো মানুষ। রান্না, গোসল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে প্রতিদিন। বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্নআয়ের পরিবার, ভাড়াটিয়া বাসিন্দা এবং বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকরা। অনেককে দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে, আবার কেউ বাধ্য হয়ে চড়া দামে পানি কিনছেন। অথচ পানি না পেলেও প্রতি মাসে নিয়মিত বিল আদায় করছে পৌর কর্তৃপক্ষ। 

তারাব পৌরসভা দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল। এখানে অসংখ্য শিল্প-কারখানার পাশাপাশি হাজারো পরিবার বসবাস করে। এসব এলাকায় পানি সরবরাহের জন্য পৌরসভা ১০টি গভীর নলকূপ ও পাম্প স্থাপন করে সার্ভিস লাইনের মাধ্যমে যাত্রামুড়া, মোগরাকুল, মৈকুলি, দিঘীবরাবো, মাসাবো, খাদুনসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি সরবরাহ করে আসছে। তবে যাত্রামুড়া পাম্প হাউসসহ একাধিক পাম্প দীর্ঘদিন ধরে কার্যত বন্ধ থাকায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংকটের অজুহাতে দুই মাস ধরে কার্যত পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অথচ দিনে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকলেও সেই সময়ে পাম্প চালিয়ে সীমিত আকারেও পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। নির্ধারিত সময়সূচি বা রেশনিং পদ্ধতিতে হলেও পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব ছিল বলে মনে করছেন তারা। স্থানীয়রা জানান, দিনে তিন বেলা পানি ছাড়ার কথা। সকাল ছয়টা, দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৫টায় পাম্প চালু করার কথা। কিন্তু দুই মাস ধরে এক বেলাও ঠিকমতো পানি ছাড়া হয় না। বিদ্যুৎ না থাকার অজুহাতে অধিকাংশ সময়ই পাম্প বন্ধ রাখা হয়। পাম্প ছাড়ার নির্ধারিত সময়ের পর বিদ্যুৎ এলেও আর পাম্প ছাড়া হয় না। ফলে তখন এলাকায় পাইপলাইনে পানি মেলে না। বিদ্যুৎ থাকা অবস্থায় পাম্প ছাড়ার সময় হলেই কেবল সেই পাম্প চালু করা হয়।
পৌরসভার অনেক বাড়িতেই নিজস্ব ডিপ টিউবওয়েল আছে। মোটরের মাধ্যমে তারা নিজেরাই পানি তুলে ব্যবহার করেন। এসব বাড়িতে পানি নিয়ে সমস্যা নেই। তবে বেশির ভাগ বাড়িতেই বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষের বাসাগুলোয় প্রতিদিনই পানির সংকট লেগে থাকে। অনেকে আশপাশের ডিপ টিউবওয়েল থেকে বা পাম্পগুলো থেকে কিছুটা পানি সংগ্রহ করে কাজ চালিয়ে নেন। 
পানি না পেয়ে সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছেন দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষ। প্রতিদিন পানি কিনে ব্যবহার করা তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে পুকুর বা অনিরাপদ উৎসের পানি ব্যবহার করছে। এতে ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যাত্রামুড়া এলাকার বাসিন্দা রুকাইয়া জামান বলেন, দুই মাস ধরে ঠিকমতো পানি পাচ্ছি না। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে দিন কাটছে। বিল ঠিকই নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু পানি দেওয়া হচ্ছে না। পৌরসভায় একাধিকবার গিয়েও কোনো সমাধান পাইনি।

স্থানীয় একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক আকলিমা বেগম বলেন, আমাদের অল্প আয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তাঁর ওপর প্রতিদিন টাকা দিয়ে পানি কিনে খাওয়া সম্ভব নয়। অনেক সময় গোসলও করা যায় না। শুধু খাবার পানির জন্য অনেক দূরে যেতে হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারাব পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আতাউর রহমানের কাছে একাধিকবার অভিযোগ জানানো হলেও কার্যকর কোনো সমাধান মেলেনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হয়েও নাগরিকরা মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের মতে, বিদ্যুৎ সংকট থাকলেও সম্পূর্ণ পানি সরবরাহ বন্ধ থাকার যৌক্তিকতা নেই। পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট সময়ে পাম্প চালিয়ে অন্তত সীমিত পরিসরে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যেত। দীর্ঘদিনেও কার্যকর কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ না করা প্রশাসনিক ব্যর্থতার পরিচয় বহন করে।

এ বিষয়ে তারাব পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আতাউর রহমান বলেন, দুর্ব্যবহারের অভিযোগ সঠিক নয়। অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে পাম্প চালানো যাচ্ছে না। ফলে পানি উত্তোলন ও সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমরা কাজ করছি।
নারায়ণগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর ডিজিএম নাজমুল হাসান বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে সারাদেশেই লোডশেডিং বেড়েছে। তবে তারাব পৌরসভা এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
তারাব পৌরসভার প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম জয় বলেন, বিদ্যুতের স্বল্পতার কারণে সব পাম্প একসঙ্গে চালানো সম্ভব হচ্ছে না। আমরা ধাপে ধাপে পাম্প চালিয়ে নিয়মিত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। তিনি আরও বলেন, কোনো কর্মকর্তা গ্রাহকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে থাকলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
 

আরও পড়ুন

×