লাইনের লিকেজে ঘরে জমছে গ্যাস, আগুনে পুড়ছে শরীর
শরীফ উদ্দিন সবুজ, নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:৫৯ | আপডেট: ০৮ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫২
| প্রিন্ট সংস্করণ
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার লাকি বাজার। ডিএনডি খাল পার হয়ে তিন ফুট প্রশস্ত রাস্তা দিয়ে ভেতরে সৈকত আলী গাজীর বাড়ি। এই বাড়িতে তিন ছেলে আর স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া থাকেন অটোরিকশাচালক আব্দুল কাদের। তাঁর স্ত্রী মাহীনূর বেগম বাসায় হালিম, চটপটি তৈরি করেন। দুই ছেলে মোহাম্মদ আলী ও সাকিব মায়ের তৈরি করে দেওয়া হালিম ও চটপটি বাসার কাছেই একটি স্থানে বিক্রি করেন। তাদের ছোট ভাই রাকিব একটি ডাইং ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। সবার আয়ে ভালোই চলছে সংসার। কিন্তু গত ১১ মে বাসায় আগুন লেগে দগ্ধ হন আব্দুল কাদের ও তাঁর তিন ছেলে। ঢাকার বার্ন ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন থেকে ১৫ দিন পর মারা যান আব্দুল কাদের ও রাকিব। বাকি দুজন চিকিৎসা শেষে চাঁদপুরে গ্রামের বাড়িতে চলে যান।
আব্দুল কাদেরের স্ত্রী মাহীনূর বেগম সে সময় বাইরে থাকায় বেঁচে যান। তিনি জানান, তাদের ঘরে গ্যাস জমে যায়। তাঁর স্বামী সিগারেট ধরালে তা থেকে আগুন ধরে যায় ঘরে। ধারণা করছেন, ঘরে গ্যাস জমে এই ঘটনা ঘটেছে। তারা যে কক্ষটিতে থাকতেন, সে কক্ষে কোনো ভেন্টিলেটর নেই। দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখলে ঘরে গ্যাস লিকেজ হলে তা বের হওয়ার কোনো জায়গা নেই।
শুধু এই বাড়িই নয়, নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ বাড়ির রান্নাঘরে ভেন্টিলেটর বা বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নেই। ফলে কোনো কারণে গ্যাস লিকেজ হলে তা জমে ঘরে গ্যাস চেম্বার তৈরি হয়। অসাবধানতাবশত ম্যাচ বা লাইটার জ্বালালে আগুন লেগে প্রাণ যায় অনেকের।
জেলায় ২০২৫ সালে গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ, সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ও গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকে ২১৭টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। মোট অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে ৪৭৯টি। গ্যাস-সংশ্লিষ্ট অগ্নি দুর্ঘটনার পেছনে গ্যাসের লাইনের লিকেজ, সিলিন্ডারের রেগুলেটরের ত্রুটি, সিলিন্ডার পুরোনো হওয়া, আগের দুর্ঘটনার পরে করা সুপারিশ বাস্তবায়নে উদাসীনতাকে দায়ী করলেও হতাহতের সংখ্যা বাড়ার পেছনে ঘরে বাতাস চলাচলের জায়গা না থাকাকেই মূল কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবারও গ্যাস লিকেজ থেকে ঘরে আগুন লেগে তিনজন দগ্ধ হয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জে যেসব গ্যাস দুর্ঘটনা বাসার ভেতরে ঘটেছে, সেগুলো মোটামুটি একই রকম। সবাই রাতে দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘুমিয়েছে। সকালে উঠে দরজা-জানালা না খুলেই চুলা ধরাতে গেছে বা সিগারেটের জন্য লাইটার জ্বালিয়েছে। গ্যাসের কারণে কয়েক সেকেন্ডে ওই ঘরের ভেতরে থাকা লোকজন দগ্ধ হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ গ্যাস লিকেজ ও লিকেজ থেকে বের হওয়া গ্যাস বের হতে না পারা। গ্যাস লিক করলেও যদি কক্ষে জমতে না পারে, তাহলে দুর্ঘটনা ঘটবে না। কিন্তু এখনকার বাড়ি-ঘরে ‘ভেন্টিলেটর’ থাকে না। এর বিকল্প হিসেবে এক সময় এক্সজস্টার ব্যবহার হতো। সেটিও এখন রাখা হয় না। ভেন্টিলেটর থাকলে গ্যাস লিকেজ হলেও ধীরে ধীরে ভেন্টিলেটর দিয়ে বের হয়ে যেত।
২০২০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ শহরের পশ্চিম তল্লার বায়তুস সালাত জামে মসজিদে গ্যাসের ত্রুটি থেকে আগুন লেগে ৩৪ জন মারা যান। ২০২১ সালের ৮ জুলাই রূপগঞ্জের হাশেম ফুড ফ্যাক্টরিতে আগুন লেগে ৪৪ জন নিহত হন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে মসজিদে আগুন ও ২০২১ সালে হাশেম ফুডের ঘটনার পরে জেলা প্রশাসন ও তিতাসের করা আলাদা তদন্ত কমিটি অগ্নিদুর্ঘটনা রোধে ১৮ দফা সুপারিশ করে। এসবের মধ্যে ছিল তিতাসের গ্যাস লাইন সংযোগ নিয়মিত পরীক্ষা করে ত্রুটিপূর্ণ গ্যাস লাইন সংস্কার করা, ছাদে কোনো রেস্টুরেন্ট হতে না দেওয়া এবং ছাদ ফাঁকা রাখা যাতে অগ্নি দুর্ঘটনার সময় আশ্রয় নেওয়া যায়, ভবন নির্মাণ নীতিমালা অনুসরণ করা, যে কোনো ভবনের চারপাশে পর্যাপ্ত খালি জায়গা রাখা ও না রাখলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া, সিঁড়িতে মালপত্র না রাখা, বড় ভবন বা শিল্পকারখানায় পানির রিজার্ভার তৈরি করা, গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার করলে কোনো ভবনের নিরাপদ কোনো জায়গায় সিলিন্ডার রেখে পাইপ দিয়ে গ্যাস লাইন নেওয়া, অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা রাখা ইত্যাদি।
নারায়ণগঞ্জে তিতাসের লাইনের একটি বড় অংশ ১৯৬৪ সালের। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে উন্নয়নকাজের খোঁড়াখুঁড়িতেও অনেক লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে নারায়ণগঞ্জে ৬১৯টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা কিছুটা কমে দাঁড়ায় ৪৭৯টিতে। ২০২৫ সালে গ্যাস সরবরাহ লাইনে লিকেজে আগুন লেগেছে ২০৪টি, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়েছে চারটি আর গ্যাস সিলিন্ডার লিকেজ থেকে বিস্ফোরণ হয়েছে ৯টি। ২০২৬ সালের এ পর্যন্ত আগুনের ঘটনা ঘটেছে ৭১টি। এর মধ্যে বিস্ফোরণজনিত আগুনের ঘটনা ছয়টি। গ্যাসের বিস্ফোরণের ঘটনায় শুধু মে মাসেই চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক দীপু বলেন, গ্যাস লাইনের লিকেজ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া যেসব অবৈধ লাইন নেওয়া হয়েছে সেগুলো সবাই যার যার মতো নিয়েছে।
অভিযোগ স্বীকার করে তিতাসের নারায়ণগঞ্জ জোনের ডিএমডি রাজীব কুমার সাহা বলেন, ‘এমনিতে ত্রুটিপূর্ণ লাইন মেরামত আমাদের নিয়মিত কাজের অংশ। এ ছাড়া সোনারগাঁ ও রূপগঞ্জে আমরা প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে ৯ হাজার লিকেজ সার্ভে ও মেরামত করার পরিকল্পনা নিয়েছি; যা পর্যায়ক্রমে পুরো নারায়ণগঞ্জে করা হবে।’
তিতাস গ্যাস অফিস সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ জেলায় এক লাখ ৪৩ হাজার ৭৮৯টি আবাসিক লাইন রয়েছে। এ ছাড়া বাণিজ্যিক লাইন রয়েছে এক হাজার ২১টি। এখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ দৈনিক এক হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। সেখানে তিতাস ৭০০ ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করে।
এদিকে শ্রমিকদের অধিকাংশ বাড়িতে রান্নাঘর বলতে আলাদা কিছু নেই। আবার অনেক ক্ষেত্রে কিছুটা আলাদা থাকলেও পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের জায়গা নেই। ফলে দুর্ঘটনাগুলো নিম্ন আয়ের মানুষের বসবাসের জায়গায়ই বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র যেসব ঘরে থাকে সেসব ঘরে ‘ভেন্টিলেশন’ সিস্টেম খুবই দুর্বল। বেশির ভাগ নতুন বাড়িতে ভেন্টিলেটর নেই।
নারায়ণগঞ্জে গ্যাস দুর্ঘটনার মূল কারণ জনসচেতনতার অভাব বলে মনে করেন সিটি করপোরেশনের টাউন প্ল্যানার। তিনি বলেন, বিল্ডিং কোড না মেনেই নারায়ণগঞ্জের বেশির ভাগ বাড়িঘর তৈরি হয়েছে। এসব ব্যাপারে রাজউকের ব্যবস্থা নিতে হবে।
নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ডেপুটি টাউন প্ল্যানার হিমেল বড়ুয়া বলেন, অগ্নি নিরোধে সুপারিশগুলোর মধ্যে যেগুলো রাজউক-সংশ্লিষ্ট সেগুলোর ব্যাপারে আমরা নিয়মিতই কাজ করি। ভেন্টিলেটর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান বিল্ডিং কোডে এ বিষয়ে সেভাবে কিছু বলা নেই। যদিও ভবনের দরজা-জানালাসহ বাতাস চলাচলের ব্যবস্থার ব্যাপারে বলা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রায়হান কবির বলেন, ‘সম্প্রতি গ্যাস দুর্ঘটনাগুলো আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। আমরা এ বিষয়ে তিতাস, ফায়ার ব্রিগেডসহ সবার সঙ্গে আলোচনা করেছি। তিতাসকে তাদের লাইনের ত্রুটি মেরামতের জন্য বলেছি। এ ছাড়া বাড়ি যাতে গ্যাস চেম্বার হয়ে না যায় সে জন্য সচেতনতা তৈরিতে কাজ করছি।’
- বিষয় :
- গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ
- গ্যাস