ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সকালে ভিডিও কলে ছেলেকে দেখলেন, বিকেলেই এলো মৃত্যুর খবর

সকালে ভিডিও কলে ছেলেকে দেখলেন, বিকেলেই এলো মৃত্যুর খবর
×

আট মাসের ছেলে তাসরিফকে কোলে নিয়ে মা আমেনা, পাশে তাসরিফের ফুফু ও দাদি

নওগাঁ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৪২ | আপডেট: ১০ আগস্ট ২০২৬ | ১৬:৪৩

রোববার সকাল ১০টা। সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে ভিডিও কলে আট মাসের ছেলে তাসরিফকে দেখছিলেন সোহেল রানা সুমন (৩০)। কে জানত, সন্তানকে দেখা সেই ভিডিও কলই হবে আট মাসের তাসরিফের সঙ্গে বাবার শেষ দেখা! কয়েক ঘণ্টা পরই সৌদি আরবের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনে প্রাণ হারালেন সোহেল।

এখনও হয়তো তাসরিফ বুঝতে পারছে না ‘বাবা’ আর ফিরবেন না। কিন্তু আট মাসের শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে নির্বাক হয়ে বসে আছেন মা আমেনা (২৩)। সামনে শুধু অনিশ্চয়তা—কীভাবে বড় করবেন সন্তানকে, কীভাবে চলবে তাঁদের সংসার?

নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামের বাদলের ছেলে সোহেল রানা সুমন। প্রায় ১০ বছর সৌদি আরবে থাকার পর দেড় বছর আগে দেশে ফেরেন তিনি। দেশে এসে আমেনাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর আবার জীবিকার তাগিদে সৌদি আরবে ফিরে যান। এরই মধ্যে তাঁদের ঘর আলো করে জন্ম নেয় ছেলে তাসরিফ।

সোহেলের জীবনের গল্পটি ছিল সংগ্রামের। প্রবাসে দীর্ঘদিন কাজ করে পরিবারের জন্য কিছু করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দেড় বছর আগে তাঁর বাবা বাদল হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সোহেলই ছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। বাবার মৃত্যুর পর সংসারের দায়িত্ব আরও বেশি করে তাঁর কাঁধে এসে পড়ে।

বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বল ছিল মাত্র দেড় বিঘা জমি। আর মায়ের কাছে থাকা সামান্য স্বর্ণের অলংকার। সেই জমি ও অলংকার বিক্রি করেই স্ত্রী ও অনাগত সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে আবার সৌদি আরবে পাড়ি জমান সোহেল। তাঁর স্বপ্ন ছিল—প্রবাসে কাজ করে টাকা জমাবেন, দেশে ফিরে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে একটু স্বস্তির সংসার করবেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন থেমে গেছে রিয়াদের একটি কারখানার আগুনে।

সোহেলের পরিবারে এখন কোনো পুরুষ সদস্য নেই। বাবা নেই, স্বামী নেই। পরিবারের শেষ ভরসা হিসেবে পড়ে আছে আট মাসের শিশু তাসরিফ। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানকে নিয়ে কীভাবে জীবন কাটাবেন—এই প্রশ্নই এখন আমেনার সামনে সবচেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বজনরা জানান, সংসারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সোহেল ও আমেনার অনেক স্বপ্ন ছিল। সন্তানকে ভালোভাবে মানুষ করবেন—এটাই ছিল তাঁদের সবচেয়ে বড় আশা। দূর সৌদি আরব থেকেও ছেলের খোঁজ নিতেন সোহেল। সুযোগ পেলেই ভিডিও কলে তাসরিফকে দেখতেন। গতকাল সকালেও সেই নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু সেই দেখা যে শেষ দেখা হবে, তা কেউ ভাবতে পারেননি।

সোহেলের মা স্বপ্না বেগম এখন ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। একদিকে স্বামীকে হারানোর শোক এখনও কাটেনি, তার ওপর এবার হারালেন সন্তানকে। সংসারের যে মানুষটি তাঁর শেষ বয়সের ভরসা ছিলেন, তিনিও চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।

সোহেলের একমাত্র ছোট বোন সুবর্ণার কাছেও ভাইয়ের মৃত্যু যেন বিশ্বাসের বাইরে। বাবার মৃত্যুর পর বড় ভাইই ছিলেন পরিবারের আশ্রয়। ভাইকে হারিয়ে এখন মা ও ভাবির ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় তিনি।

আর স্ত্রী আমেনার সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আট মাসের তাসরিফকে কীভাবে মানুষ করবেন? স্বামীকে হারানোর শোক সামলানোর আগেই তাঁকে ভাবতে হচ্ছে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। ছোট্ট শিশুটিকে নিয়ে একা সংসার চালানো তাঁর জন্য কতটা কঠিন হবে, সেই চিন্তায় দিশেহারা তিনি।

সোহেলের স্বজনরা বলেন, প্রবাসে গিয়ে পরিবারকে ভালো রাখার স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। বাবার রেখে যাওয়া জমি ও মায়ের অলংকার বিক্রি করে আবার বিদেশে গিয়েছিলেন। তাঁর আশা ছিল, কিছুদিন পর দেশে ফিরে আসবেন। স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে নতুন করে সংসার সাজাবেন। কিন্তু তার আগেই সব শেষ হয়ে গেল।

রোববার বাংলাদেশ সময় আনুমানিক বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাম শহরের একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ আগুনের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তের মধ্যে আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এতে কারখানায় কর্মরত অন্তত ১৭ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হন। তাঁদের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ১৩ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। সোহেল তাঁদেরই একজন।

সোহেলের বাড়িতে এখন শোকের মাতম। স্বজনদের চোখের সামনে ভাসছে মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগের সেই দৃশ্য—মোবাইলের পর্দায় বাবাকে দেখে হাসছিল আট মাসের তাসরিফ। অথচ সেই পর্দার মানুষটিই আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।

আরও পড়ুন

×