ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

খুলনার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনশন সেন্টার: অলস পড়ে আছে ১২৫ কোটি টাকার স্থাপনা

দুই তলা বেজমেন্টসহ ১৩ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পে মোট ব্যয় ১৫৯ কোটি টাকা

খুলনার অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনশন সেন্টার: অলস পড়ে আছে ১২৫ কোটি টাকার স্থাপনা
×

ফাইল ফটো

 হাসান হিমালয়, খুলনা

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০৯ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৬ | ১০:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

পাঁচতারকা মানের আবাসন, মিলনায়তন, রেস্তোরাঁ, গবেষণা, প্রশিক্ষণসহ বহুমুখী সুযোগ-সুবিধা রেখে খুলনা নগরীর শামসুর রহমান সড়কে নির্মাণ হয়েছে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনশন সেন্টার। দুই তলা বেজমেন্টসহ ১৩ তলা ভবন নির্মাণ প্রকল্পে সব মিলিয়ে ব্যয় হয়েছে ১৫৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু দুটি ভবন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় আসবাব, উপকরণ দিয়ে ব্যবহার উপযোগী করতেই ব্যয় হয়েছে ১২৫ কোটি টাকার বেশি। ২০২৪ সালের ৩০ জুন প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও স্থাপনাটি এখনও চালু করা যায়নি।

আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত খুলনার অন্যতম দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা এটি। পাঁচতারকা মান ধরে রাখতে রেস্তোরাঁ, রান্নাঘর, ক্যাফেটেরিয়া, ব্যয়ামাগারের বেশির ভাগ সরঞ্জাম আনা হয়েছে দেশের বাইরে থেকে। কোটি কোটি টাকার এসব সরঞ্জাম দুই বছর ধরে সেভাবেই পড়ে আছে। অনেক কিছুর ওয়ারেন্টির মেয়াদ শেষ হতে বসেছে।

বিভাগীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, বিপুল ব্যয়ে নির্মিত ভবনটি কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় লাগছে। সর্বশেষ পাঁচতারকা হোটেল পরিচালনায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থাপনাটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সে জন্য ইজারামূল্যও নির্ধারিত হয়। চূড়ান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়া ঝুলে রয়েছে এক বছরের বেশি সময় ধরে। 

প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা জানান, খুলনায় পাঁচতারকা কোনো হোটেল নেই। একই ভবনে আবাসন, প্রশিক্ষণ, বড় ও মাঝারি মিলনায়তন ও রেস্তোরাঁ সুবিধা না থাকায় দেশি-বিদেশি অনেক সম্মেলন, সভা-সেমিনার ঢাকায় আয়োজন করতে হয়। এক জায়গায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের বিষয়টি মাথায় রেখে নগরীর শামসুর রহমান সড়কে বিভাগীয় প্রশাসনের ৬১ শতক জমিতে ‘খুলনা শহরে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ কনভেনশন সেন্টার নির্মাণ’ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। পরে অবশ্য আরও ১২ শতক জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে।

খুলনা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের নেওয়া প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি একনেকে অনুমোদন হয়। শুরুতে প্রকল্প ব্যয় ছিল ১২৮ কোটি টাকা। এরপর প্রথম দফা প্রকল্প সংশোধন করে ব্যয় ১৪৬ কোটি এবং সর্বশেষ দ্বিতীয় দফা সংশোধন করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ১৫৯ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৩০ জুন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। প্রধান স্থপতি হিসেবে সম্পূর্ণ প্রকল্পের মূল নকশা ও স্থাপত্য পরিকল্পনা তৈরি করেন স্থপতি নাজিম উদ্দিন পায়েল।

যেসব সুযোগ-সুবিধা রয়েছে
পাঁচতলা ও ১৩ তলা দুটি ভবন মিলিয়ে সেন্টারটি নির্মাণ করা হয়েছে। মাটির নিচে দুই তলায় পার্কিংয়ে ৭৫টি গাড়ি রাখা যাবে। ১৩ তলা ভবনটিতে ৬৬টি কক্ষ রয়েছে। এ ছাড়া ৪৫০ আসনের একটি মিলনায়তন, ২০০ আসনের সম্মেলন কক্ষ, বিভিন্ন আসনের আরও ৯টি সেমিনার, সভা, লেকচার, প্রশিক্ষণ কক্ষ রয়েছে। ১২০ আসনের মাল্টিপারপাস গ্যালারিতে রয়েছে মুভি দেখার ব্যবস্থা।

৮ মাত্রার ভূমিকম্প সহনশীল এবং বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থাসহ ভবনটিতে রয়েছে দুই হাজার ২০০ বর্গফুটের প্রদর্শনী কেন্দ্র, বিশাল লাইব্রেরি, ব্যায়ামাগার, শিশুদের জন্য খেলার জায়গা, বড়দের অভ্যন্তরীণ খেলার জায়গা, সাড়ে চার হাজার বর্গফুটের রেস্তোরাঁ, ছাদে সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটের বিশাল সুইমিংপুল এবং পুলের পাশে আরেকটি ক্যাফেটেরিয়া রয়েছে।

ভবন দুটিতে সাতটি লিফট, কেন্দ্রীয়ভাবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের জন্য ৪৫০ টন এসি, আন্তর্জাতিক মানের ফায়ার ফাইটিং এবং ফায়ার প্রটেকশন সিস্টেম, ডক্টরস চেম্বার, উন্মুক্ত বারবিকিউ সেন্টার, বিল্ডিং ম্যানেজমেন্ট ও সাউন্ড সিস্টেম, এক হাজার ও ৫০০ কিলোওয়াটের দুটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন জেনারেটরসহ আধুনিক সব সুবিধাই রয়েছে ভবনে। 

স্থান নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক
প্রকল্পের শুরু থেকেই স্থান নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা চলছে। মাত্র ৩০ ফুট প্রশস্ত শামসুর রহমান সড়কে এত বড় স্থাপনা এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের সংযোগ ঘটানোর আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শামসুর রহমান সড়কটি আহসান আহমেদ ও খানজাহান আলী সড়কে মিলিত হয়েছে। একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল থাকায় প্রায়ই সড়ক দুটিতে যানজট লেগে থাকে। 

অবশ্য প্রকল্পের সাবেক পরিচালক ও খুলনার অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আবু সায়েদ মো. মনজুর আলম বলেন, কেডিএর মাস্টারপ্ল্যানে সড়কটি ৫০ ফুট ছিল। ভবিষ্যতে সড়কটি চওড়া করার পরিকল্পনাও ছিল। এটি মাথায় রেখেই নকশা প্রণয়ন করা হয়। শেষ পর্যন্ত সড়ক প্রশস্ত হয়নি।

তিনি বলেন, যানজট এড়াতে ভবনের সামনের অংশ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রেখে, গাড়িগুলো সরাসরি সেন্টারের ভেতরে আনার সুযোগ রাখা হয়েছে. যার কারণে সড়কের ওপর গাড়ির কোনো চাপ থাকবে না। 
মনজুর আলম জানান, সেন্টারটি ইজারা দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা খুলনা ঘুরে গেছেন। খুব শিগগির এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে। নির্মাণ উপকরণ, কাজ ও সরঞ্জামের মানের বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হয়নি। 

আরও পড়ুন

×