ঢাকা শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সম্ভাবনার হোসিয়ারি শিল্পে মন্দার হাওয়া

সম্ভাবনার হোসিয়ারি শিল্পে মন্দার হাওয়া
×

এবিএম ফজলুর রহমান, পাবনা 

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:১৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

স্থলপথে ভারতে পণ্য রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকটে পড়েছে পাবনার হোসিয়ারি শিল্প। একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়ছেন হাজারো শ্রমিক। উদ্যোক্তারা বলছেন, জলপথে রপ্তানির সুযোগ থাকলেও বাড়তি সময় ও পরিবহন ব্যয়ের কারণে তা দিয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। দ্রুত স্থলপথে রপ্তানি চালু করা না গেলে সম্ভাবনাময় এ শিল্পের বড় অংশই বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।

যেভাবে ঝুট থেকে বস্ত্রশিল্পের যাত্রা 
পাবনার এই হোসিয়ারি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল গার্মেন্টস কারখানার উচ্ছিষ্ট বা ঝুট কাপড়। দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকে ফেলে দেওয়া নমুনা ও কাটিংয়ের কাপড় সংগ্রহ করে তা প্রক্রিয়াজাত, কাটিং ও সেলাইয়ের মাধ্যমে তৈরি করা হয় গেঞ্জিসহ বিভিন্ন ধরনের পোশাক। কম দামের এই পণ্যের বড় বাজার ছিল ভারত। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি স্থলপথে এসব পণ্য ভারতের বিভিন্ন বাজারে পাঠানো হতো। ফলে ঝুট কাপড় একদিকে যেমন বর্জ্য থেকে সম্পদে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে পাবনার গ্রামাঞ্চলে তৈরি করেছে বড় ধরনের কর্মসংস্থান।

কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাস থেকে স্থলপথে ভারতে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডে নেমেছে ধস। উদ্যোক্তাদের দাবি, রপ্তানির প্রধান বাজার হারিয়ে যাওয়ায় এরই মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন হাজারো শ্রমিক। যারা এখনও টিকে আছেন, তারাও উৎপাদন কমিয়ে কোনোমতে ব্যবসা চালাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের তৈরি পোশাক কারখানায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ নমুনা ও কাটিংয়ের উচ্ছিষ্ট কাপড় ফেলে দেওয়া হয়। সেই ঝুট কাপড়ই পাবনার হোসিয়ারি শিল্পের প্রধান কাঁচামাল। প্রক্রিয়াজাত, কাটিং ও সেলাইয়ের মাধ্যমে এসব উচ্ছিষ্ট কাপড় থেকে তৈরি করা হয় উন্নত মানের গেঞ্জিসহ বিভিন্ন পোশাক। এরপর ডিজাইন ও প্যাকেজিং শেষে তা দেশের বাজারে সরবরাহের পাশাপাশি রপ্তানি করা হয় বিভিন্ন দেশে।

সম্ভাবনার শিল্পে রপ্তানির পথ বন্ধ
গত এক দশকে পাবনা সদর উপজেলার আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে গড়ে ওঠে ঝুট কাপড় থেকে গেঞ্জি তৈরির দেড় হাজারের বেশি ছোট-বড় কারখানা। এসব কারখানায় প্রতিবছর উৎপাদন হতো ১৮ থেকে ২০ কোটি পিস গেঞ্জি। এর বাজারমূল্য ছিল এক হাজার ২০০ কোটি থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা। দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভারত, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে এসব পণ্য রপ্তানি হতো।
ভারতের সঙ্গে স্থলপথে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরই সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। বিশেষ করে পেট্রাপোল, হিলি, চেংড়াবান্ধাসহ বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে যে পণ্যগুলো যেত, তা এখন আগের মতো পাঠানো যাচ্ছে না। জলপথে রপ্তানির সুযোগ থাকলেও তাতে সময় ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ভারতীয় বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাবনা শহরের বাজিতপুর এলাকার জয়নব খাতুন বলেন, ‘আমি একটি হোসিয়ারি কারখানায় শ্রমিকের কাজ করতাম। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এক বছর ধরে বেকার। আগে কাজ করে সংসারে সহযোগিতা করেছি। এখন কাজের জন্য কখনও কখনও এলাকার বাইরে যেতে হচ্ছে।’

হোসিয়ারি কারখানার মালিক হাসিবুর রহমান বাবু বলেন, ‘আমরা অস্তিত্ব সংকটে রয়েছি। আমার কারখানা এক বছর ধরে বন্ধ। বেনাপোল ও হিলি দিয়ে ভারতে পণ্য রপ্তানি করতাম। রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কারখানা চালানো সম্ভব হয়নি। আমার প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৩০০ শ্রমিক কাজ করতেন। এখন সবাই বেকার।’
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ফোরকান রেজা বাদশা বিশ্বাস বলেন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে শীতল সম্পর্কের কারণে স্থলপথে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। শিল্পটিকে বাঁচাতে দ্রুত কার্যকর সরকারি উদ্যোগ না এলে একসময় সম্ভাবনাময় এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যেতে পারে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পাবনার হোসিয়ারি শিল্প এখন শুধু ব্যবসায়িক সংকটে নয়, বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকটেরও মুখে। উদ্যোক্তাদের দাবি, দ্রুত স্থলপথে রপ্তানির সুযোগ ফিরিয়ে আনা এবং বিকল্প বিদেশি বাজার তৈরিতে সরকারি সহায়তা না মিললে ঝুট কাপড়কে সম্পদে পরিণত করে গড়ে ওঠা এই শিল্পের বড় অংশই হারিয়ে যেতে পারে।

৫৪২ কারখানার ৬০ শতাংশে ঝুলছে তালা
ঝুট কাপড়কে সম্পদে পরিণত করে পাবনায় গড়ে উঠেছিল ৫৪২টি হোসিয়ারি কারখানা। গ্রামের অসহায় নারী ও বেকার যুবকেরা এসব কারখানায় কাজ করে সপ্তাহে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতেন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেকেই এখন বেকার। এরই মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। জলপথে রপ্তানি চালু থাকলেও অতিরিক্ত সময় ও ব্যয়ের কারণে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে উদ্যোক্তাদের জন্য। দ্রুত কার্যকর সরকারি উদ্যোগ না এলে একসময় সম্ভাবনাময় এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।’
জেলা হোসিয়ারি মালিক গ্রুপের সভাপতি মনির হোসেন পপি বলেন, ‘হোসিয়ারি শিল্পকে ঘিরে পাবনায় অন্তত ৩০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। রপ্তানি বন্ধের পর আনুমানিক পাঁচ 
হাজার শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন এবং ৬০ শতাংশ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘ঝুট কাপড়কে কাজে লাগিয়ে এই শিল্প শুধু উদ্যোক্তাদেরই নয়, গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এখন রপ্তানি বাজার সংকুচিত হওয়ায় পুরো শিল্পই হুমকির মুখে।’
হোসিয়ারি মালিক গ্রুপের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মো. মোখলেছুর রহমান জিতু বলেন, জলপথে রপ্তানি চালু থাকলেও অতিরিক্ত সময় ও ব্যয়ের কারণে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে উদ্যোক্তাদের জন্য। তাই ভারতের সঙ্গে দ্রুত স্থলবন্দর দিয়ে এই পণ্য রপ্তানির সুযোগ পুনরায় 
চালু করা না হলে পাবনার সম্ভাবনাময় হোসিয়ারি শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। শুধু কারখানার মালিক নয়, এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হাজারো শ্রমিকও বিপদে পড়বেন।’

ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগেরও
ঝুট কাপড় পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে পাবনার হোসিয়ারি শিল্প একদিকে যেমন কর্মসংস্থান তৈরি করেছিল, অন্যদিকে তৈরি পোশাক কারখানার বর্জ্যকে নতুন পণ্যে রূপ দেওয়ার সুযোগও সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু রপ্তানি বাজার সংকুচিত হওয়ায় সেই পুনর্ব্যবহারভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থা হুমকিতে পড়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পাবনার সহকারী পরিচালক মো. ইউসুফ আলী বলেন, ঝুট কাপড় পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে একদিকে শিল্পের কাঁচামাল পাওয়া যায়, অন্যদিকে বস্ত্রবর্জ্য কমে। এ ধরনের শিল্প বন্ধ হয়ে গেলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী এই হোসিয়ারি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রুত রপ্তানি জটিলতা নিরসন, বিকল্প আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধান এবং ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশাসনিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। সার্বিক সংকট অনুধাবন করে ইতোমধ্যে আমদানি-রপ্তানি অনুবিভাগ ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি, দ্রুতই এ সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান মিলবে।’

আরও পড়ুন

×