বিশ্ব মশা দিবস আজ
সাড়ে চার বছরে খরচ ১৪ কোটি টাকা, প্রাণ গেছে ২২৩ জনের
শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:০০
| প্রিন্ট সংস্করণ
মশা মারতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) কাগজে-কলমে চার বছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকা খরচ করেছে। তবে এত টাকা খরচের পরও থামানো যায়নি মানুষের মৃত্যু। মশার কামড়ে উল্টো প্রতিনিয়ত দীর্ঘ হচ্ছে মৃতের সংখ্যা, বাড়ছে আক্রান্তের হারও। মশাবাহিত রোগ শুধু ডেঙ্গুতেই সাড়ে চার বছরে প্রাণ গেছে রেকর্ড ২২৩ জনের, আক্রান্ত হয়েছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। এ থেকে বাদ যাননি শিশু থেকে বয়স্করাও।
মশা মারতে প্রতিবছর সংস্থাটি কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করলেও বছরের বেশির ভাগ সময় মশক নিধন কার্যক্রম দৃশ্যমান না হওয়ার অভিযোগ বাসিন্দাদের। বর্তমানে দিন ও রাতে মশার অত্যাচার আরও বেড়েছে। তবে তিন থেকে চার মাস ধরে ওষুধ ছিটাতে কাউকে দেখা না যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যার প্রমাণ মিলেছে স্বাস্থ্য প্রশাসনের জরিপেও। বেশির ভাগ এলাকায় ঝুঁকিসীমার তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে লার্ভা।
২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই পাঁচ অর্থবছরে প্রায় ১৪ কোটি টাকার ওষুধ ও যন্ত্রপাতি কিনেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে অ্যাডাল্টিসাইড (পূর্ণবয়স্ক মশা মারার ওষুধ) কিনতে পাঁচ কোটি ২১ লাখ টাকা এবং লার্ভিসাইড (লার্ভা ধ্বংসকারী ওষুধ) কিনতে ব্যয় করা হয়েছে সাত কোটি ৪৮ লাখ টাকা। ফগার মেশিন ও হ্যান্ড স্প্রে মেশিন কিনতে ব্যয় হয়েছে এক কোটি ৩০ লাখ টাকা। গত ৩০ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য মশক নিধন খাতে ২৫ কোটি টাকার বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়। মশার কারণে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন ধরনের রোগব্যাধি বেড়ে যাওয়ায় এত বড় বাজেট রাখার কথা জানান সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। গত অর্থবছরে এ খাতে বাজেট রাখা হয়েছিল পাঁচ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সাড়ে চার বছরের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ সালে প্রাণ গেছে ৪১ জনের, আক্রান্ত হয়েছেন পাঁচ হাজার ৪৪৫ জন। ২০২৩ সালে প্রাণ যাওয়া ও আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। বছরটিতে প্রাণ গেছে ১০৭ জনের, আক্রান্ত হয়েছেন রেকর্ড ১৪ হাজার ৮৭ জন। ২০২৪ সালে প্রাণ যায় ৪৫ জনের, আক্রান্ত হন চার হাজার ৩২৩ জন। ২০২৫ সালে প্রাণ যায় ২৭ জনের ও আক্রান্ত হন চার হাজার ৮৬৪ জন। চলতি বছরের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে তিনজনের, আক্রান্ত দেড় হাজার।
কোটি টাকার মশার ওষুধেও মরেনি মশা
স্বাস্থ্য বিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, বাসাবাড়িতে স্বাভাবিক মাত্রা থাকার কথা ৫ শতাংশের নিচে। অথচ লার্ভা মিলেছে ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা ৫ গুণেরও বেশি। পানির পাত্রে এডিস মশার লার্ভার অস্তিত্ব মিলেছে ৩৩ দশমিক ৪ শতাংশ। এটির স্বাভাবিক মাত্রা ১০ শতাংশ। যা স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণেরও বেশি। পাত্র ও বাড়ির অনুপাত সূচকে ২০ শতাংশের নিচে থাকার কথা থাকলেও, লার্ভা মিলেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ। এডিস মশার ঘনত্ব খুঁজে বের করতে স্বাস্থ্য প্রশাসনের পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য মিলেছে। গত ৮ থেকে ২০ জুন নগরীর ১৮টি ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়িতে এটি পরিচালিত হয়।
মশার ওষুধ না দেওয়ার অভিযোগ
বেশির ভাগ এলাকায় মশার উপদ্রব বাড়ার অভিযোগ বাসিন্দাদের। বেশ কয়েকটি এলাকায় সোম ও মঙ্গলবার সরেজমিন গিয়ে এর সত্যতাও মিলেছে। বাসিন্দারা বলছেন, আগে বছরে এক মৌসুম মশার উপদ্রব থাকলেও এখন বছরজুড়েই তা থাকছে।
উত্তর কাট্টলী এলাকার বাসিন্দা সীমা ইসলাম বলেন, দিন ও রাতে মশার অত্যাচার অনেক বেড়েছে। তবে তিন মাসেও কাউকে ওষুধ ছিটাতে দেখিনি। পার্শ্ববর্তী এলাকায় বেশ কয়েকজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় শঙ্কার মধ্যে আছি।
বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা মোজাম্মেল হক বলেন, নানা কোম্পানির কয়েল জ্বালিয়েও মশার হাত থেকে রেহাই মিলছে না। শিশুদের নিয়ে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। খতিবের হাটের বাসিন্দা লিপি আক্তার বলেন, চার মাসে মশার ওষুধ ছিটাতে দেখিনি।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, মশাবাহিত রোগ নির্মূলে মশা মারার বিকল্প নেই। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে করপোরেশনকে বারবার তাগাদা দিচ্ছি। সঠিক সময়ে মশা মারতে না পারলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দীন বলেন, প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অনেকেই ভর্তি হচ্ছেন। রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় আলাদা ওয়ার্ড খোলা হয়েছে। আক্রান্তের হার নিয়ন্ত্রণে দায়িত্বশীলদের কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন বলেন, মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়লেও নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি কম। মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা জরুরি। অথচ নগরের নর্দমা, খাল, কিংবা ঘরের চারপাশে পানি জমে থাকে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের কার্যকর উপস্থিতিও প্রশ্নবিদ্ধ। জবাবদিহিতা না থাকায় মশার কামড়ে প্রাণ যাচ্ছে অনেকের।
চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সমকালকে বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সকালে লার্ভিসাইড এবং বিকেলে অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ১৪টি বিশেষায়িত ফগার মেশিন সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- বিষয় :
- দিবস আজ