প্রাণিসম্পদের প্রকল্প কাগজে আছে, বাস্তবে কাজ নেই
ত্রিশালে দুই কোটি ৬১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
ময়মনসিংহের ত্রিশালের বামনাখালী গ্রামে কেসি এগ্রোর তালাবদ্ধ ল্যাব। দুধ সংগ্রহের কোনো কার্যক্রম সেখানে চলে না। সম্প্রতি তোলা -সমকাল
মতিউর রহমান সেলিম, ত্রিশাল (ময়মনসিংহ)
প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৩৩ | আপডেট: ২১ আগস্ট ২০২৬ | ০৯:৫০
| প্রিন্ট সংস্করণ
ময়মনসিংহের ত্রিশালে প্রান্তিক খামারিদের কাছ থেকে ন্যায্য দামে দুধ সংগ্রহ এবং সংরক্ষণে ডেইরি হাব ও ভিলেজ মিল্ক কালেকশন সেন্টার (ভিএমসিসি) স্থাপনের নামে দুই কোটি ৬১ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সাইনবোর্ডসর্বস্ব এ প্রকল্প কাগজে-কলমে সম্পন্ন হয়েছে। যদিও খামারিরা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না।
প্রকল্পের নাম ‘প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্প (এলডিডিপি)’। বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রাণিসম্পদ খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, পশুপাখির উৎপাদনশীলতা ও সর্বোপরি খামারিদের ভাগ্যোন্নয়ন।
ত্রিশালে উদ্যোক্তা ছিলেন ভালুকা উপজেলার ধলিয়া গ্রামের আতিকুল্লাহ বাহার। অসাধু কর্মকর্তাদের যোগাসাজশে তিনি এই টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে আতিকুল্লাহ বাহার সমকালকে বলেছেন, প্রকল্পের দুই কোটি ৬১ লাখ টাকাই তিনি পেয়েছেন। তিনি এও দাবি করেন, ত্রিশাল উপজেলার বৈলর, রাগামারা, বগারবাজার ও উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সংলগ্ন চারটি স্থানে দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব স্থানে দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের সাইনবোর্ড ঝোলানো এবং কথিত ল্যাব স্থাপনের নামে কিছু যন্ত্রপাতিও রাখা হয়েছিল। প্রতিদিন ৫০০ থেকে এক হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করার কথা থাকলেও এ ধরনের কোনো কার্যক্রম চালানো হয়নি।
প্রকল্প সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামাঞ্চলে খামারিদের কাছাকাছি এলাকায় দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন করার কথা। সেখানে আধুনিক ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে দুধের মান (চর্বি ও এসএনএফ) নির্ধারণ করে খামারিদের সঠিক মূল্য পরিশোধ করতে হবে। আর ডেইরি হাবস একাধিক কেন্দ্র থেকে দুধ সংগ্রহ করে সেন্ট্রাল চিলিং মেশিনে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করবে। পরে বড় বড় দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করবে। এ জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ডেইরি হাবস ও ভিএমসিসি স্থাপন প্রকল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক খামারিদের উৎপাদিত দুধ ন্যায্যমূল্যে সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের একটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের উদ্যোগ নেয়। আধুনিক ল্যাব টেস্টের যন্ত্রাংশ ক্রয়ে সরকার ম্যাচিং গ্রান্টের মাধ্যমে মোট খরচের ৫০ শতাংশ (অনধিক দুই কোটি ৬১ লাখ টাকা) আর্থিক সহায়তা ও অনুদান দেয়। বাকি অর্থ উদ্যোক্তা নিজ তহবিল থেকে বহন করবেন।
ত্রিশালে ২০১৯ সালে কার্যক্রম শুরু হলেও কয়েক ধাপে মেয়াদ বাড়িয়ে কাগজে-কলমে দেখানো হয় এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে চলতি বছরের মার্চে। সমকালের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অর্থ আত্মসাতের চিত্র। উপজেলার বৈলর ইউনিয়নের মঠবাড়ী দাখিল মাদ্রাসা রোড এলাকার বাসিন্দা ও খামারিদের সঙ্গে কথা হয়। সেখানে একটি ঘরে কথিত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছিল। ঘরটির মালিক আবুল কাশেম। তিনি জানান, এখানে দুধ সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা শরিফুল ইসলাম একটি যন্ত্র এনে ছয়-সাত মাস রেখেছিলেন। কিন্তু কোনো খামারির কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করা হয়নি।
স্থানীয় দুগ্ধ খামারি মিন্টু ও রবিন বলেন, তাদের ১০-১২টি করে দুধেল গাভি আছে। দুধ বিক্রি করা নিয়ে অনেক সময় বিপাকে পড়ি। অথচ এ এলাকায় সরকারিভাবে আধুনিক ল্যাব স্থাপন করে দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র করা হচ্ছে– এই খবর তাদের কানেও আসেনি।
সদর ইউনিয়নের রাগামারা বাজার এলাকায় একটি দোকানের সামনে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। দোকানঘরের মালিক রমজান আলী বলেন, সামনে সাইনবোর্ড টানালেও দুধ সংগ্রহের কোনো কাজ হয়নি এখানে। মাঝেমধ্যে তিন-চারটি গাড়ি নিয়ে কর্মকর্তারা আসতেন। কিছুক্ষণ থাকতেন। ছবি তুলতেন। এর পর সবাই চলে যেতেন।
বাগান গ্রামের দুগ্ধ খামারি মোনায়েম বলেন, ‘আপনার কাছ থেকেই প্রথম জানতে পারলাম, আমাদের এলাকায় প্রান্তিক খামারিদের সুবিধার্থে সরকারি সহায়তায় এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প চালু হয়েছিল।’
আমিরাবাড়ী ইউনিয়নের বগারবাজার এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেও সেখানে আধুনিক ল্যাব স্থাপন করে দুধ সংগ্রহের কেন্দ্রের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। দুধ সংগ্রহের কোনো তথ্যপ্রমাণ মেলেনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় সংলগ্ন রিয়াদুল ইসলামের ওখানেও।
জানতে চাইলে উদ্যোক্তা আতিকুল্লাহ বাহার বলেন, প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার দেওয়া তালিকা অনুযায়ী ত্রিশালের খামারিদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। তারা প্রতি লিটার দুধ ৬০ টাকার কমে বিক্রি করতে রাজি হননি। লিটারে ১০ টাকা ভর্তুকি দিয়ে দুই মাস চালিয়ে পরে ময়মনসিংহের ভালুকা, ফুলপুর ও সিরাজগঞ্জ থেকে দুধ সংগ্রহ করেন।
ত্রিশালে কাগজে-কলমে দুধ সংগ্রহ করা ফটোসেশন করার বিষয়ে জানতে চাইলে আতিকুল্লাহ বলেন, ‘কিছু দুধ আমি ত্রিশাল থেকে সংগ্রহ করেছিলাম। পরে কার্যক্রম চালু রাখা হয় উপজেলার বামনাখালী গ্রামে আমার কে সি এগ্রো নামে খামারে।’
আতিকুল্লাহ বাহারের দেওয়া ঠিকানার সূত্র ধরে ৪ আগস্ট বামনাখালী গ্রামে গিয়ে কে সি এগ্রো নামে সেই খামারের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু প্রকল্পের দুধ সংগ্রহের কোনো কার্যক্রম সেখানেও ছিল না। শেডগুলো ছিল ফাঁকা, কোনো গাভির দেখা মেলেনি। কথিত সেই ল্যাব কক্ষটি ছিল তালাবদ্ধ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখানে কখনও দুধ সংগ্রহের কার্যক্রম চালানো হয়নি। এখানে শুধু দই জমিয়ে তা বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হতো। মাঝেমধ্যে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা এখানে আসতেন। তারা আরও জানান, আতিকুল্লাহর মামারবাড়ি বামনাখালী গ্রামে। মামাকে অংশীদার দেখিয়ে এখানে গরুর খামারের শেড নির্মাণ করে ব্যাংক থেকে মোটা অঙ্কের ঋণ নিয়েছিলেন। পরিশোধ না করায় ঋণখেলাপি হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয়েছিল।
গত ৮ আগস্ট ফুলপুর উপজেলার শাহপুর বাজারে গিয়ে কে সি এগ্রো খামার নামে কোনো দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র পাওয়া যায়নি। তবে সেখানে নিরাপদ এগ্রো নামে মাত্র একটি দুধ সংগ্রহ কেন্দ্র রয়েছে। মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তি এটির পরিচালক। বিষয়টি নিশ্চিত করেন দেড় বছর ধরে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালনকারী জাহিদ হোসেন।
এ ছাড়া ভালুকা উপজেলার প্রশিকার মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, একটি ঘরের সামনে কে সি এগ্রো নামে সাইনবোর্ড আছে। কিন্তু সেখানেও প্রকল্পের কোনো কার্যক্রম হয়নি। ঘরটি তালাবদ্ধ থাকায় ১১ আগস্ট দুপুর ২টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে কে সি এগ্রোর কাউকে পাওয়া যায়নি। নাসিমা বেগমসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, বছরখানেক আগে এই ঘর ভাড়া নিয়ে দই-মিষ্টি তৈরি করা হতো। কয়েক মাস চলার পর সেখানে মাঝেমধ্যে দুধ-ডিম বিক্রি করা হতো।
জানতে চাইলে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘প্রকল্পটি আমার তত্ত্বাবধানে না। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার মাধ্যমে সরাসরি পরিচালনা করেছে এলডিডিপির প্রধান কার্যালয়। আমি শুধু প্রতিনিধি হিসেবে জানতাম। সব কার্যক্রম তাদের মাধ্যমেই হয়েছে। ত্রিশালের দায়িত্বে থাকা এ প্রকল্পের উপপ্রকল্প পরিচালক ড. হিরণ্ময় বিশ্বাস স্যারসহ যারা ছিলেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এ বিষয়ে খোঁজ নিতে পারেন।’
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ওয়াহেদুল আলম বলেন, ‘প্রকল্পের খোঁজ নিতে অনেকবার আমি উদ্যোক্তা বাহারকে ফোন দিয়েছিলাম। সে আমার ফোনই রিসিভ করেনি। আপনি অনুসন্ধান করে যা পেয়েছেন, আমিও তাই জেনেছি। সরকারের অনুদান দেওয়া প্রকল্প সে যেহেতু চালু রাখে নাই, তাহলে তাকে এত টাকা কেন দেওয়া হলো? প্রয়োজনে তদন্ত করে সরকার আবার টাকা নিয়ে নেবে। তা ছাড়া দায়িত্বে নিয়োজিত টিম ঢাকা থেকে এসে কয়েকবার নাকি এ প্রকল্প দেখে গেছে।’
ত্রিশালের দায়িত্বে থাকা উপপ্রকল্প পরিচালক হিরণ্ময় বিশ্বাসের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি মোবাইল ফোন ধরেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠালেও কোনো উত্তর দেননি।
- বিষয় :
- অভিযোগ
- ত্রিশাল
- প্রাণিসম্পদ খাত